নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যানে নিজের ‘প্রাণনাশের আশঙ্কা’ প্রকাশ করেছেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান।
এর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপক্ষ তাকে স্বশরীরে হাজির না করে কারাগার থেকে ভার্চুয়ালি শুনানিতে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
একই দিন ট্রাইব্যুনালে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেখানে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে গুমের পর ‘পেট চিরে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার’ মতো ভয়ংকর অভিযোগের কথা উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানি শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানান প্রসিকিউটর তামিম।
‘প্রাণনাশের আশঙ্কা’ ও ভার্চুয়াল শুনানির প্রস্তাব
এদিন ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানিকালে বিচারকদের অনুমতি নিয়ে জিয়াউল আহসান নিজেই কথা বলেন। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আদালতকে বলেন, “আমি আশঙ্কা করছি যে, আমাকে যখন জেলখানা থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়, তখন রাস্তায় কেউ কোনো একটা ঘটনা ঘটিয়ে আমার ওপর দায় চাপাতে পারে।”
এ কারণে তাকে একা প্রিজন ভ্যানে না এনে অন্যান্য আসামির সঙ্গে আনার জন্য একটি লিখিত আবেদনও করেন তিনি।
তার এই বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের মতামত জানতে চান। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু তিনি আসা-যাওয়ার পথে অপ্রীতিকর ঘটনা বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন, তাই সবার সঙ্গে আনলে সেই ঝুঁকি অন্যান্য আসামিদের ক্ষেত্রেও তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: জিয়াউল আহসানকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে: আইনজীবী নাজনীন নাহার
প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আমাদের আবেদন হলো—উনাকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে উপস্থাপন করার দরকার নেই। করোনাকালে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, যা এখনও প্রচলিত আছে, জেলের ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করে উনাকে কারাগার থেকেই অডিও-ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়ালি হাজির করানো হোক। সেখান থেকেই তিনি ট্রাইব্যুনাল এবং তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছেন।
‘পেট চিরে লাশ ভাসানো হতো নদীতে’
এদিন ট্রাইব্যুনালে মামলার ১৫তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তার সাক্ষ্যের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী জানান, ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে ভিন্ন মত ও পথের ব্যক্তিদের জোরপূর্বক গুম, অপহরণ ও হত্যার যে ‘সিস্টেমেটিক ক্রাইম’ বা সংস্কৃতি শুরু করেছিল, তার অন্যতম হোতা ছিলেন এই জিয়াউল আহসান।
তামিমের ভাষ্যে, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, যারাই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলত বা লিখত, তাদের গুম করে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা অথবা মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হতো।
প্রসিকিউটর বলেন, ২০০৯ সালের পরপরই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে প্রেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে এনটিএমসি, এনএসআই ও র্যাবে দীর্ঘসময় কাজ করেছেন। বিশেষ করে র্যাবের গোয়েন্দা পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) পদে থাকার সময় তিনি অসংখ্য মানুষকে অবৈধভাবে আটকে রেখে গুম করেছেন।
তাদেরকে হত্যা করে পেট চিরে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রাথমিক তদন্তে এসব ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন এবং সেই বর্ণনাই ট্রাইব্যুনালে দিয়েছেন, যোগ করেন তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়েই এ মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য উপস্থাপন আজকেই শেষ হচ্ছে।
প্রসিকিউটর জি এইচ তামিমের দাবি, ১৫ জন সাক্ষীর মাধ্যমেই জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষ তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করবে এবং জেরার জন্য তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নিতে পারবে। এ ছাড়া এদিন ট্রাইব্যুনালে একটি রিভিউ আবেদনেরও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানান তামিম।
আরএনবি/এআরএম