জেলা প্রতিনিধি
০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪২ এএম
দেশের নদীগুলোতে আবারও শুরু হলো ইলিশ মাছ ধরার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। মা ইলিশের বাধাহীন প্রজনন নিশ্চিতের লক্ষ্যে বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাত থেকে এ নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে।
সরকারের আরোপিত আইন মেনে গভীর সমুদ্র থেকে তীরে ফিরে আসছে জেলে ট্রলার। ইতোমধ্যে পটুয়াখালীর অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মহিপুর-আলিপুর, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবালীসহ উপকূলের হাজারো জেলেরা বিভিন্ন নদ-নদীতে আশ্রয় নিয়েছে। তবে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আবারও সমুদ্রে ২২ দিনের অবরোধ নিয়ে জেলেদের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে।
জেলেদের দাবি, এখনো ইলিশের পেটে ডিম আসেনি। মাছটির প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদফতরের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। এরপরও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন জেলেরা।
তবে বঙ্গোপসাগরে নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেদের আগ্রাসন বন্ধে দেশের জলসীমানায় নৌবাহিনীসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়ানো, প্রণোদনার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ তা প্রকৃত জেলেদের মাঝে বণ্টনের দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।
এদিকে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে চলছে শেষ সময়ের বেচাকেনা। ক্রেতা বিক্রেতার মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি।
কুয়াকাটা আশার আলো জেলে সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি নিজাম শেখ বলেন, সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে বেশিরভাগ জেলেরাই শূন্য হাতে তীরে ফিরে আসছে। সমুদ্রে আর আগের মতো মাছ ধরা পরছে না। সমুদ্রে দেশি বিদেশি ট্রলিং বোর্ডের পাশাপাশি ভারতীয় জেলেদের আধিপত্য চলছে। এসব বন্ধে সরকারের কোনো উদ্যোগ না থাকলেও বারবার অবরোধ দিয়ে জেলেদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে মৎস্য অধিদফতর।
জেলে আ. রহিম বলেন, এমনিতেই সাগরে মাছ পাচ্ছি না, তারপর এখন আবার নিষেধাজ্ঞা, সরকারি আইন মানতেই হবে। তবে সরকার তাদের যে প্রণোদনা প্রদান করেন, তা সঠিক সময় দেয় না, তাও চাহিদা চেয়ে অনেক কম। তাই সব জেলেদের দাবি যাও কিছু চাল দেয় সেটি সঠিক সময় আরো বৃদ্ধি করা হোক।
ট্রলারের মাঝি মো. সোলায়মান বলেন, আমরা জেলেরা বিভিন্ন এনজিও, ব্যাংকে ঋণে জর্জরিত, তার সঙ্গে আবার দাদনের বোঝা। এই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জেলে ব্যবসায় জড়িত সব ব্যবসায়ী হতাশ।
মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমবায় মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, এই দুই তিন বছর সাগরে মাছ পড়ছে না, তারপর যখনই একটু মাছের মুখ দেখা মিলে তখনই আবার আবহাওয়া খারাপ। এই নিষেধাজ্ঞার সময় বঙ্গপোসাগরে নৌ-বাহিনী, কোস্টগার্ড ভালোভাবে ডিউটি করা উচিত। অবরোধের সুযোগে বার্মা ও ভারত আমাদের জলসীমানায় ঢুকে চুরি করে মাছ ধরে নিয়ে যায়।
আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার সমিতির নেতা আ. জলিল ঘরামি বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার প্রতি সম্মান রেখে জেলেরা বুধবার মধ্যরাতের আগেই জেলেরা সমুদ্র থেকে তীরে ফিরে আসবে। এরই মধ্যে অনেক ট্রলারে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রেতাশ্রায়ে এসে নোঙর করে বাড়ি ফিরে গেছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছর ইলিশের আকাল গেছে। কিছু কিছু জেলে ট্রলার মাঝে মধ্যে কিছু মাছ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
৫৮ দিনের অবরোধের শেষে একের পর এক দুর্যোগে জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারেনি। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই ২২ দিনের অবরোধ জেলে আড়তদারদের হতাশ করেছে। তারা এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।
চলতি বর্ষা মৌসুমেই জেলেদের দুর্যোগের মধ্যদিয়ে গেছে। সমুদ্রে মাছ নেই, জেলে ও আড়তদারদের ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এরপরও জেলেরা সরকারের আইন মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছে।
কলাপাড়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, মা ইলিশসহ সামুদ্রিক সব ধরনের মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে। সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে লাভ মৎস্যজীবীদের।
তিনি বলেন, ২২ দিনের অবরোধকালীন সময়ে কলাপাড়া উপজেলার ১৮ হাজার নিবন্ধিত জেলেদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেদেরও পর্যায়ে ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বাজারজাতজাত করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন বলে জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।
এএইচ