Dhaka Mail Logo

জাতীয়

এলপিজির দামে বড় লাফ, এবার থামবে কি নৈরাজ্য?

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১২ পিএম

রাজধানীর অনেক বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও চুলায় ঠিকমতো গ্যাস মিলছে না। দিনের পর দিন এমন সংকটে রান্নার বিকল্প হিসেবে বাড়ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর নির্ভরতা। কিন্তু সেই বিকল্প জ্বালানির বাজারেও স্বস্তি নেই। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ থেকে হাজার টাকা বেশি দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার বাড়তি দাম দিয়েও সময়মতো সিলিন্ডার মিলছে না।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়েছে বিইআরসি। নতুন দর অনুযায়ী, এখন থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হবে ১ হাজার ৮৩৭ টাকায়। সেপ্টেম্বরে এই দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ একদিকে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারি দামও বড় অংকে বাড়ানো—সব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি এলপিজির বাজারের নৈরাজ্য থামবে, নাকি ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়বে?

বিইআরসি জানিয়েছে, নতুন দর রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। অক্টোবরের জন্য বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য ভ্যাটসহ প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ দাম ছিল ১৩২ টাকা ১২ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা ৯৪ পয়সা।

শুধু ১২ কেজির সিলিন্ডার নয়, বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দামও বাড়ানো হয়েছে। ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডার ৮৪২ টাকা, ১২ দশমিক ৫ কেজি ১ হাজার ৯১৩ টাকা, ১৫ কেজি ২ হাজার ২৯৬ টাকা, ১৬ কেজি ২ হাজার ৪৪৯ টাকা, ১৮ কেজি ২ হাজার ৭৫৫ টাকা, ২০ কেজি ৩ হাজার ৬১ টাকা, ২২ কেজি ৩ হাজার ৩৬৭ টাকা, ২৫ কেজি ৩ হাজার ৮২৭ টাকা এবং ৩০ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ৫৯২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩৩ কেজির দাম ৫ হাজার ৫১ টাকা, ৩৫ কেজি ৫ হাজার ৩৫৭ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ৬ হাজার ৮৮৮ টাকা করা হয়েছে।

যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে। প্রতি লিটারের দাম ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। সেপ্টেম্বরে এ দাম ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা

বিইআরসির ব্যাখ্যা, সৌদি আরামকোর অক্টোবর মাসের প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি) বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অক্টোবরে প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার। প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ ধরে গড় সৌদি সিপি ধরা হয়েছে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার। সেপ্টেম্বরে গড় সৌদি সিপি ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৫ ডলার।

এর সঙ্গে বেড়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজভাড়া ও ব্যবসায়িক প্রিমিয়ামও। অক্টোবরে প্রতি মেট্রিক টনে এ খাতে ২৫০ ডলার বিবেচনায় নিয়েছে বিইআরসি। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১৬০ ডলার। অর্থাৎ এ খরচ বেড়েছে ৯০ ডলার।

অন্যদিকে অক্টোবরের দাম নির্ধারণে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ধরা হয়েছে ১২৩ টাকা ১৮ পয়সা। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ ডলারের দামে বড় কোনো চাপ না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধিই এবার দাম বাড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে এসেছে।

বাজারে নৈরাজ্য থামবে তো?

দাম বাড়ানোর সরকারি ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগে ভোক্তাদের ভোগান্তি চরমে। সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ বিভিন্ন এলাকায় সেটি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ নতুন সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণের পরও যদি বাজারে আগের মতো অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভোক্তার সংকট কাটার বদলে তা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটে যারা বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন, তাদের জন্য এটি বাড়তি ব্যয়ের বড় বোঝা।

এলপিজির বাজারে সরবরাহ সংকট নিয়ে অবশ্য একেক পক্ষের বক্তব্য একেক রকম। সরকার ও আমদানিকারকদের একাংশের দাবি, দেশে এলপিজির সামগ্রিক মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আবার বাজারের খুচরা চিত্র বলছে, অনেক জায়গায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি ও কার্গো সংকটের কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে ডিলারদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলোই প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ দিচ্ছে না। আবার সরকারের পক্ষ থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) সরকারের কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা এলপিজির একটি অংশ বাজারে না ছেড়ে মজুত করে রাখার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। নাম আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বড় আমদানিকারকদের হাতে থাকা এলপিজির মজুত যাচাই, কোন চালান কখন দেশে এসেছে, কখন খালাস হয়েছে, কতটা গুদামে ছিল এবং কতটা বাজারে ছাড়া হয়েছে—এসব তথ্য পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এ অবস্থায় নতুন দাম ঘোষণার পাশাপাশি বাজার তদারকিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দাম নির্ধারণ করলেই ভোক্তার দুর্ভোগ শেষ হবে না; নির্ধারিত দামে সেই দাম কার্যকর করাও নিশ্চিত করতে হবে।

বিইআরসি বলেছে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতাসহ কোনো পর্যায়েই কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বোতলজাত এলপিজি, রেটিকুলেটেড এলপিজি বা অটোগ্যাস বিক্রি করা যাবে না। অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে বাজার তদারকি জোরদারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

জেবি