নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
প্রস্তাবিত সাইবার আইনকে ভিন্নমত দমনের নতুন ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নামে অতীতের নিপীড়নমূলক আইনি কাঠামোই নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এই আইন করা হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পথেই এগোবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর তোপখানা রোডে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান কার্যালয়ে ‘প্রস্তাবিত সাইবার আইন: জবান বন্ধের নয়া বন্দোবস্ত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন হাসনাত কাইয়ূম।
বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টরা অংশ নেন। শুরুতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক, গবেষক ও আইনজীবী রোকন রকি।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নামে ভিন্নমত দমনের যে ধারা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী তারই নতুন রূপ। গণ-অভ্যুত্থানের পর নিপীড়নমূলক আইনি কাঠামো বদলের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এই সংশোধনী তার বিপরীত বলে দাবি করেন তিনি।
প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন বিধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি। তিনি বলেন, ‘আশঙ্কা’ থেকে ‘বিশ্বাসে’র ভিত্তিতে কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা মন্ত্রণালয় ও সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থাকে দেওয়া হলে আদালতের আদেশ ও প্রমাণ ছাড়াই মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে রাজনৈতিক স্বার্থে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকবে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘বিএনপিকে আমরা এখনো অভ্যুত্থানের শক্তি, আমাদের আন্দোলনের সাথী বলে মনে করতে চাই। এই আইনের মাধ্যমে বিএনপি ফ্যাসিস্ট হাসিনার পথে এগিয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যুত্থানের সময় যেমন এক ছাত্রদল কর্মী বলেছিলেন, কেউ কাউরে ছাইড়া যাইয়েন না; আমরা তেমনি বিএনপিকে অনুরোধ করছি, আপনার অভ্যুত্থান ছাইড়া যাইয়েন না।’
সরকার তাদের আহ্বান না শুনলে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি।
গোল টেবিলে গীতিকবি ও অ্যাক্টিভিস্ট শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, ‘এটা সাইবার সুরক্ষা আইন হচ্ছে না। এটা তারা সরকার সুরক্ষা আইন বানাচ্ছেন।’
ডিএসএ ভিক্টিমস নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার অভিযোগ করেন, কোনো আলোচনা ছাড়াই ‘সাইবার পুলিশ’ করা হয়েছে। নাগরিকদের ওপর নিপীড়নের সুযোগ আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সরকার জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে দল-মত নির্বিশেষে আবারও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবী আমাতুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের সরকারগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করে এবং এর পরিণতি কখনো ভালো হয়নি।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, সরকার বারবার সংবিধানের কথা বললেও নিজেরাই সংবিধান মানছে না। নাগরিকেরা যেন স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) স্থায়ী কমিটির সদস্য কে এম জাবির, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) সংগঠক বাকী বিল্লাহ, গ্রিন পার্টির মহাসচিব ইউসুফ আম্মার, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক জালাল আহমেদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। বৈঠক সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।
উল্লেখ্য, সরকারি আইনভান্ডারে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ এবং ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রকাশিত রয়েছে। সংশোধনী আইনটি ১ জুলাই ২০২৬-এ প্রণীত হয় এবং এর মাধ্যমে মূল আইনের ২০ ধারা বিলুপ্ত করা হয়।
এমএইচ/এসআই