জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম
দেশে একটি মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল রাজধানী ঢাকার অদূরে (৫১ কিলোমিটার দূরে) নরসিংদী জেলার শিবপুর। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ২।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর।
তবে এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রগুলোও বলছে, মৃদু ভূমিকম্পের কারণে সাধারণ মানুষ ঠিকঠাকভাবে টের পাননি।
ভারতীয় ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস) বলছে, নরসিংদীর এই ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের অন্তত ৩৬ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে।
যদিও এদিন সারা বিশ্বে ৪০টির বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করলেও বাংলাদেশ তথা নরসিংদীর ভূমিকম্পটি রেকর্ড করেনি মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা- ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)।
তবে ইউরোপিয়ান ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) নরসিংদীর ভূমিকম্পটি রেকর্ড করেছে।
এনসিএসের তথ্যের ভিত্তিতে ইএমএসসি জানায়, বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টা ১৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ড ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়। এটি নরসিংদী থকে ১৬ কিলোমিটার উত্তরে উৎপত্তি ঘটে।
এর আগে, চলতি বছরের ১৭ আগস্ট নরসিংদীতে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তারপর রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩। এ ছাড়া, সে সময়ও এর উৎপত্তিস্থল ছিল শিবপুর।
তারও আগে, ২২ জুন নরসিংদী ও আশপাশের এলাকায় ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল তখন নারায়ণগঞ্জ।
সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদীতে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ওই ভূমিকম্পের হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
পাশাপাশি গত বছরের ২১ নভেম্বর (শুক্রবার) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে অনুভূত ওই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। ভূমিকম্পটি ভারতেও অনুভূত হয়েছিল।
নরসিংদী বা নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন স্থানে অতীতে ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। তা ছাড়া সিলেটসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অতীতে ভূমিকম্পের উৎপত্তির ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট এবং চট্রগ্রামের টেকটোনিক মুভমেন্টের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৭.৫ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের পূর্বাভাসও হতে পারে।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জন্য অনেকটাই অসম্ভব। তবে প্লেট মুভমেন্টের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব। তবে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের অবকাঠামো খুবই সীমিত। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, প্লেটগুলোর মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বহু গুণ বাড়বে। যদিও এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, উন্নত অবকাঠামো এবং সঠিক পরিকল্পনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক ভূমিকম্প হয়। তবে এগুলোর অনেকগুলোই আমরা টের পাই না বা অনুভব হয় না। তবে এই ছোট কম্পনগুলো একেকটা বড় ভূমিকম্পের বার্তা।’
এই ভূতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘মূলত যেখানে একবার ভূমিকম্প হয়, সেখানেই আবার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কারণ সেখানে শক্তি জমা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়, এই বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহিৃত করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব সিলেট অঞ্চল থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার তথা চট্রগ্রাম অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এই অঞ্চলে অতীতে বড়মাত্রা ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। এই অঞ্চলের মাটির নীচে যে পরিমাণ শক্তি জমায়িত রয়েছে তাতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। এটি যখন তখনই ঘটতে পারে।’
ভূমিকম্পের প্রস্তুতি সম্পর্কে এই ঢাবি অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের ভূমিকম্প সংঘঠিত হওয়ার পূর্বে ও পরে এবং ভূমিকম্প সংঘঠিত হওয়ার সময়ের প্রস্তুতি অনির্বায্যভাবে আমাদের নিতে হবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে আবশ্যিকভাবে ভূমিকম্পের বিষয় অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। কারণ আমরা এমন একটি জায়গায় বসবাস করি যেখানে ভূমিকম্প ঘটবেই।’
রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সমীক্ষাও আতঙ্ক বাড়িয়েছে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে। পুরো রাজধানীজুড়ে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাগুলো। এসব ভবনের বেশিরভাগই নির্মাণ হয়েছে নিয়ম-কানুন না মেনে, পুরোনো নকশায় বা দুর্বল ভিত্তির ওপর। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা ভবনগুলোর ওপর করা এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ভবনই ২০ থেকে ৩০ বছর আগের নির্মিত। অনেক জায়গায় রড-সিমেন্টের মান নিয়ন্ত্রণ হয়নি, আবার কোথাও অতিরিক্ত ভবন তৈরি করা হয়েছে অনুমোদিত নকশার বাইরে। ফলে সামান্য কম্পনেও এসব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন নগরবিদরা।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, সক্রিয় ভূমিকম্প প্রবণতার মধ্যে অবস্থান করছে দেশ। বিশেষ করে ত্রিভুজাকার ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের চাপ বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের দিকে বাড়ছে। তারা বলেন, ‘ঢাকা এত ঘনবসতিপূর্ণ যে বড় ভূমিকম্প হলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, মিরপুর ও যেসব এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভবন গড়ে উঠেছে সেসব এলাকা।
সেইফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে বিল্ডিং নির্মাণ করার জন্য যে, কোড রয়েছে। সেই কোড অনুযায়ী বিল্ডিং নির্মাণ না করা হয়, তাহলে সেটি হবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প ৩০-৪০ সেকেন্ডের হয়, তাহলে ঢাকা শহরের ৭২ হাজার বিল্ডিং ধসে পড়বে। সেটি উদ্ধার করার মতো যন্ত্রপাতি বা সক্ষমতা আমাদের নেই। বাহিরের (বিদেশ) সহায়তা ছাড়া আমরা মোকাবিলা করতে পারবো না।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে, ভবনগুলো রয়েছে, সেগুলো ঝুঁকি নিরুপন করা গুরুত্বপূর্ণ। আমি বা আপনি যে, ভবনে বসবাস করছি, সেটি কতটুকু ঝুঁকি মুক্ত এবং কী কী ঝুঁকি রয়েছে। ভবনটা নিরাপদ করতে হলে কী কী করা প্রয়োজন, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে এবং পদক্ষেপ নিতে হবে। সেইসঙ্গে বিল্ডিং কোড মানার কঠোর নির্দেশনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এএম