নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩১ এএম
চট্টগ্রাম শহরের যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং ও ড্রপিং বে না থাকায় সড়কের ওপর গাড়ি রাখা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত জুলাই থেকে অভিযান শুরু করেছে সিডিএ। গত দুই মাসে নগরের অন্তত ২০টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চারটি স্কুল ও দুটি সুপারশপে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন, আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে হাসপাতাল ও স্কুল পরিচালনা এবং পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান, ফার্মেসি বা গুদাম তৈরির মতো অনিয়ম পাওয়া গেছে।
সিডিএর অভিযানের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পার্কিংয়ের জায়গা উন্মুক্ত করেছে। কেউ কেউ পার্কিংয়ের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও যানজট কমাতে ক্লাসের সময় পরিবর্তন ও নিজস্ব বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিধিমালায় যা আছে
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের ব্যবহারযোগ্য আয়তন, শয্যাসংখ্যা বা শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে নির্দিষ্টসংখ্যক গাড়ি রাখার জন্য পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক।
একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতা বা শিক্ষার্থীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য মূল সড়কের বাইরে ভবনের নিজস্ব সীমানার মধ্যে ড্রপিং বে রাখার বিধান রয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো, যাত্রী ওঠানামার সময় মূল সড়কে গাড়ি দাঁড়িয়ে থেকে যেন যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে।
তবে চট্টগ্রামের অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এসব বিধিমালা মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান, ফার্মেসি বা অন্য স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে রোগী, স্বজন, শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের গাড়ি সড়কের ওপর রাখতে হচ্ছে।
অভিযানে যেসব অনিয়ম
সিডিএর অভিযানের বিবরণ অনুযায়ী, নগরের ব্যস্ত জিইসি মোড় এলাকার মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল, এশিয়ান হাসপাতাল, ন্যাশনাল হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, সিএসসিআর ও মেডিকেল সেন্টারে বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনার বিষয়টি পাওয়া গেছে।
ল্যানসেট হাসপাতালে আবাসিক ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পার্কিংয়ের জায়গায় ফার্মেসি ও দোকান পাওয়া যায়। ইবনে সিনা, ডেল্টা ও ডক্টরস হাসপাতালে পর্যাপ্ত পার্কিং ও ড্রপিং বে পাওয়া যায়নি।
পার্কভিউ হাসপাতালে ২০ ফুটের ড্রপিং বের পরিবর্তে ১৫ ফুট জায়গা পাওয়া যায়। সেখানে পার্কিং এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারও রাখা ছিল।
এশিয়ান, একুশে, সার্জিস্কোপ, মেডিকেয়ার ও পিস পার্ক হাসপাতালেও নির্ধারিত পার্কিং পাওয়া যায়নি। মেট্রোপলিটন হাসপাতালে পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে গাড়ি পার্ক করা হচ্ছিল না। রয়েল ও মেডিকেল সেন্টারে পার্কিং অপর্যাপ্ত এবং সিএসসিআর তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি বলে জানিয়েছে সিডিএ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আল-হিদায়াহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুল (চট্টেশ্বরী) ও চিটাগাং আইডিয়্যাল স্কুলে অভিযান চালানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পার্কিং না রাখার বিষয়টি পাওয়া যায়।
আল-হিদায়াহ স্কুলে পার্কিংয়ের জায়গায় পাঠদান কার্যক্রম ও ফুডকার্ট স্থাপন করা হয়েছিল। অনিয়ম পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি নকশা অনুযায়ী পার্কিং উন্মুক্ত করতে এক থেকে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সিডিএ।
অভিযানের পর পরিবর্তন
সিডিএ জানিয়েছে, অভিযানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ফলোআপ ও সমন্বয় সভা করা হয়েছে। ২৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক গণপরিবহন চালু এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগরের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
অভিযানের পর ন্যাশনাল হাসপাতাল পার্কিংয়ের জায়গায় থাকা লন্ড্রি ও অফিস সরিয়ে জায়গাটি উন্মুক্ত করেছে। এতে পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা ৪০টি গাড়িতে উন্নীত হয়েছে বলে সিডিএ জানিয়েছে।
ম্যাক্স হাসপাতাল ইবাদতখানা সরিয়ে পার্কিং উন্মুক্ত করেছে। মেট্রোপলিটন হাসপাতাল ডিজিটাল বোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। রয়েল হাসপাতাল আশপাশের খালি জায়গা ভাড়া নিয়ে পার্কিংয়ের পরিধি বাড়াচ্ছে। সিএসসিআর, ডেল্টা ও ডক্টরস হাসপাতাল নতুন স্থানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও যানজট কমাতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠদান ভিন্ন সময়ে শুরু ও শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
এশিয়ান হাসপাতাল নিয়ে অভিযোগ
সিডিএর অভিযানে অনিয়ম পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নগরের জিইসি মোড়ের এশিয়ান হাসপাতালও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালটির পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নেই এবং আবাসিক ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযান হলেও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের মালিক মো. সালাউদ্দিন আহমেদ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সিডিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছাড় নয়, বলছে সিডিএ
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় কোনোটিতেই পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নেই। তারা সিডিএর অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না রেখেই বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বেলায়েত হোসেন বলেন, আংশিক পার্কিং ব্যবস্থা দেখিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যতদিন তিনি দায়িত্বে আছেন, এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন।
কাউকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নগরের যানজট নিরসন ও ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কাউকে সমীহ করার বিষয়টি ঠিক নয়। যেখানে অনিয়ম পাওয়া গেছে, সেখানে সমাধানের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের প্রশ্নে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরবর্তী পরিদর্শনে হাসপাতালের আকার অনুযায়ী পার্কিং ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলে কোনো অজুহাত না শুনে সরাসরি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এআরএম