Dhaka Mail Logo

জাতীয়

৯ বছরে ১৪৬ হাতির মৃত্যু: মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে উদ্যোগ নেবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

দেশে বন্য হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের সঙ্গে সংঘাত। বন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাতির আবাসস্থল ও করিডোর রক্ষা, সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং আগাম সতর্কতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে ‘হাতি সংরক্ষণ: বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), আইইউসিএন বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স, আরণ্যক এবং দীপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বন্য হাতি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব গুরুতর সংকটের মুখে। দেশে বন্য হাতির চলাচল মূলত শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বেশি।

তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে দেশে আনুমানিক ২৬৮টি হাতি ছিল। বন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংকুচিত হওয়া, বন উজাড়, খাদ্য সংকট, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদকে মানব-হাতি সংঘাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, হাতি লোকালয় বা কৃষিজমিতে ঢুকে পড়লে মানুষ ও হাতি— উভয়েই ঝুঁকিতে পড়ে।

Elephant1

এ কারণে সংঘাতের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর দেন তিনি। হাতির আবাসস্থল ও ঐতিহ্যগত চলাচলের করিডোর রক্ষা, সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ মন্ত্রী।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এশীয় হাতির চলাচলের জন্য বিস্তৃত এলাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ফলে হাতি সংরক্ষণের কাজ তুলনামূলক জটিল এবং কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়। এজন্য বন অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় করা প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় হাতি শিকার ও পাচারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, এসব এলাকায় নজরদারি বাড়াতে বন অধিদফতর ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে।

একই সঙ্গে সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনার সময় হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। হাতিসহ বড় বন্যপ্রাণী যাতে নিরাপদে পারাপার হতে পারে, অবকাঠামো পরিকল্পনাতে সেরকম ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বন্দি হাতির ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়ে পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, বন্দি হাতির লাইসেন্স, সংখ্যা ও অবস্থার যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের নামে হাতিকে শিকলে রাখা, প্রহার ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং সার্কাসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের বিষয়গুলো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা হাতির যথাযথ চিকিৎসা ও দায়িত্বশীল আচরণও নিশ্চিত করতে হবে।

Elephant2

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মানব-হাতি সংঘাত কমানো এবং বন্দি হাতির সংখ্যা, অবস্থান, লাইসেন্স ও কল্যাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা হবে।

বেলার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, পক্ষীবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আলী রেজা খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) শামিমা বেগম প্রমুখ।

এমএইচ/এফএ