নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ‘নিবর্তনমূলক ও গণবিরোধী’ ধারাগুলো অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’।
একইসঙ্গে দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজ, কুমিল্লায় কিশোর হত্যা, সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা, ডাকসুতে ইতিহাস বিকৃতি এবং শিল্পকলা একাডেমির নানা অনিয়মের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর এই মোর্চা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের পক্ষে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। মোর্চার আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপনসহ ১৫ জন সংগঠক এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ। অথচ প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারায় এমন কিছু বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক ক্ষমতা দিতে পারে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘এ ধরনের বিধান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও পরবর্তী সাইবার সুরক্ষা আইনের নিবর্তনমূলক আইনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহলেও অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।’
সরকারের কোনো কর্মকর্তা কোনো তথ্যকে ‘যাচাই করা হয়নি’, ‘ভুল তথ্য’ বা ‘গুজব’ হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধের আওতায় আনার সুযোগ পেলে, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
খসড়া আইনে আদালতের পূর্বানুমোদন ছাড়াই কনটেন্ট ব্লক করার সুযোগের সমালোচনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার মতো অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে কনটেন্ট অপসারণের সুযোগ থাকলে তার অপব্যবহার হতে পারে। এছাড়া ‘অবমাননাকর’, ‘ভীতিকর’ বা ‘মানহানিকর’ শব্দের অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী ও সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হতে পারেন।
দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজ এবং কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় বিবৃতিতে। গত ছয় মাসে বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্কের কথা তুলে ধরে এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপগুলো জনগণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধার নিন্দা জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘স্বাধীন দেশে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ।’ কোথাও যেন আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অন্যায়ভাবে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, শিল্প-সংস্কৃতির জাতীয় প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্র হতে পারে না। একাডেমির অতীতে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশেরও দাবি জানান তারা।
সম্প্রতি ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাস বিকৃতি অভিযোগে প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ এ ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত করা যাবে না। ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান নেতৃবৃন্দ।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী অন্যদের মধ্যে রয়েছেন- বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লালটু, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘের কোষাধ্যক্ষ দীনবন্ধু দাশ, গণসংস্কৃতি কেন্দ্রের সমন্বয়ক জাকির হোসেন, সমাজচিন্তা ফোরামের আহ্বায়ক কামাল হোসেন বাদল, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের সমন্বয়ক বিমল কান্তি দাশ, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. হারুনুর রশীদ, বাংলাদেশ থিয়েটারের দলপ্রধান খন্দকার শাহ আলম, বাংলাদেশ মাইম এসোসিয়েশনের সভাপতি ম. আবু হারুন টিটো, সংজোয়ারের সাধারণ সম্পাদক অংকন চাকমা, উদীচীর সহ-সাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান, চারণের সহসভাপতি কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া, বিবর্তনের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুন নূজহাত মনীষা এবং বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের সম্পাদক ইনজামাম।
আরএনবি/এএইচ