নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে সুদবিহীন ব্যাংকিং চালু এবং সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
তারা বলেন, অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনা থেকে জনগণকে মুক্ত করতে ইসলামী অর্থব্যবস্থার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম আন্তর্জাতিক বইমেলা মঞ্চে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ল রিসার্চ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার’ আয়োজিত দুই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সেন্টারের ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম খলিফার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী আন-নদভী। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট ব্যাংকার ও সেন্টারের উপদেষ্টা মু. ফরীদ উদ্দীন আহমদ এবং সেন্টারের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন।
অনুষ্ঠানে ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ এবং ‘প্রচলিত আইনের ইসলামীকরণ: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসেন এবং ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে চান। তবে ব্রিটিশ শাসন-পরবর্তী সময় থেকে স্বাধীনতার পরও ইসলামি আইন বাস্তবায়নের প্রশ্নে এ দেশের ইসলামপ্রিয় মানুষ বারবার হতাশ হয়েছেন। একইসঙ্গে সমাজে ইসলামি অনুশাসন নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কারণে ইসলামের মানবিক ও সর্বজনীন কল্যাণমূলক আইন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
তারা বলেন, ২০২৪ সালের গণআন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশে অপশাসন, দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে এগিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্ত করতে সুদবিহীন অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ এবং ‘প্রচলিত আইনের ইসলামীকরণ: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ বই দুটি বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করতে পারে। দেশের স্থিতিশীল পরিবর্তনের লক্ষ্যে বই দুটি পড়া প্রয়োজন বলেও তারা মন্তব্য করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হচ্ছে। অথচ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম হলেও অনেকেরই এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।

তিনি বলেন, ‘একেকজন একেক দলের অনুসারী হতে পারেন, তবে আমরা ইসলামের অনুসারী। আমরা যদি মুসলমান দাবি করি, তাহলে পরস্পরের সহযোগী হতে হবে। পাপের কাজে কেউ সহযোগিতা চাইলে সেখানে সহযোগিতা করা যাবে না। এভাবে চলতে পারলে দেশে ইসলামী পরিবেশ তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার।’
উপাচার্য আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইসলামী ল রিসার্চ সেন্টারের একটি ম্যাগাজিনকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তখন তিনি এর প্রতিবাদ করেছিলেন বলেও জানান।
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত সব আইন অনৈসলামিক নয়। অনেক আইনই ইসলামী আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রচলিত আইনের ইসলামীকরণ নিয়ে প্রকাশিত বইয়ে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
সেন্টারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যাংকার ফরীদ উদ্দীন আহমদ বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে জানতে হলে এ ধরনের বই পড়তে হবে। ইসলামী ব্যাংক ও প্রচলিত বা কনভেনশনাল ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য কী, তা জানা জরুরি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী আন-নদভী বলেন, হালাল উপার্জন না করলে কোনো ইবাদত কবুল হবে না। ইসলামী আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিরুদ্ধে অনেকে না বুঝে বিরোধিতা করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘ইসলামী ব্যাংকিং’ বইয়ের লেখক ড. মুহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বলেন, বাজারে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে অনেক বই থাকলেও সেখানে কিছু বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেছেন। সেই জায়গা থেকেই বইটি লেখার উদ্যোগ নেন। ব্যাংকিং খাতে রাসুল (সা.)-এর নীতিমালার আলোকে বইটি লেখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সেন্টারের ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম খলিফা ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে সমাজে বিদ্যমান নানা ভুল ধারণা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সুদ ও ঋণের ভারে আমাদের জনগণ পিষ্ট হচ্ছে। প্রচলিত সুদভিত্তিক ও বঞ্চনাপ্রবণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সুদভিত্তিক ব্যাংকিং থেকে বের হয়ে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অপরাধ থেকে সমাজ ও দেশকে রক্ষা করতে হলে সর্বক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসন ও আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এমআর/এএইচ