ঢাকা মেইল ডেস্ক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম
বাংলাদেশে ২০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। রবিবার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে আজ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। সংশোধিত মূল্য অনুযায়ী এখন ডিজেলের দাম বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা প্রতি লিটার।
এই মূল্যবৃদ্ধির পর থেকেই সাধারণ মানুষ ও সচেতন পাঠকদের মনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে, বিশ্ববাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববাজারে যখন দাম কমছে, তখন বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল কেন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তাৎক্ষণিক দামের সঙ্গে দেশের ভেতরের খুচরা বাজারের দাম সরাসরি ও রাতারাতি যুক্ত থাকে না। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বাস্তব ও কারিগরি কারণ।
বিশ্ববাজারের দাম বনাম আমদানির বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক বাজারে এই মাসের মাঝামাঝিতে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৭ ডলারে উঠেছিল। গতকাল রাতে তা ১০০ ডলার এবং পরবর্তীতে ৯৬ ডলারে নেমে আসে। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল মাত্র ৬২ ডলার। অর্থাৎ, গত ছয় মাসের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে প্রায় ১০৭ ডলারে পৌঁছেছিল।
অনেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার খবর দেখে ভাবছেন দেশের বাজারেও তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিজেরা তেল উৎপাদন করে না, সম্পূর্ণ আমদানি করে। সৌদি আরবের ইয়ানবু (Yanbu) বন্দর থেকে আমদানিকৃত তেল চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ দিন সময় নেয়। অর্থাৎ, বর্তমানে যে দামে তেল আসছে, তা ১৩ থেকে ১৫ দিন আগের কেনা এবং সেই সময়ের বাজারদর অনুযায়ী নির্ধারিত।

একইভাবে, আজ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সেই প্রভাবে আমদানিকৃত তেল দেশে পৌঁছাতে আরও সমপরিমাণ সময় লাগবে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি সৌদি চালানের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ১৩-১৫ দিনের পরিবর্তে প্রায় ৫০ দিন সময় লাগার তথ্যও রয়েছে।
ইরান থেকে তেল কেনা সম্ভব নয় কেন?
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ইরান থেকে তেল আমদানি করা হয় না কেন? এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি (Eastern Refinery) মূলত নির্দিষ্ট কিছু নির্দিষ্ট ক্রুড প্রসেস করার জন্য উপযোগী। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি (BPC) মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রুড রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করেছে। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর বিকল্প হিসেবে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার ক্রুড রিফাইনারি-কম্প্যাটিবল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ইরানি ক্রুড সস্তা হলেই তা সরাসরি এনে রিফাইনারিতে ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য ক্রুডের কেমিক্যাল কম্পোজিশন, রিফাইনারি কনফিগারেশন, ইল্ড ও ব্লেন্ডিংয়ের বিষয়গুলো জড়িত। এছাড়া ইরানের জ্বালানি খাতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাংলাদেশ তেল কিনলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, ডলার লেনদেন, জাহাজ ও বিমা ব্যবস্থায় সেকেন্ডারি স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে দেশের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেনে বড় বিপর্যয়ে পড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব দেশের পোশাক খাতসহ অন্যান্য রপ্তানি খাতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে।
বর্তমান জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা
বর্তমান পরিস্থিতি যে কতটা গুরুতর, তা অনুধাবন করা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ ও বাব আল মান্দেব, এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীই বর্তমানে বন্ধ। সৌদি আরবের পূর্ব পাশ থেকে পশ্চিম পাশ পর্যন্ত তেল নিয়ে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপে তেল পরিবহনের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও হামলার কারণে বন্ধ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি উৎপাদনকারী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে তারা বাধ্য হয়ে আমেরিকা থেকে এলএনজি আমদানি করছে।
আরও পড়ুন: বাধ্য হয়েই তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
এর আগে ২০২২ সালে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম এক লাফে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছিল। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই সময়ের পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (BPC) মার্চ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিপিসির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২,৮৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গত ছয় মাসে গড়ে প্রতি মাসে ৩,৮১৩ কোটি টাকা বা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার। স্বেচ্ছায় কোনো সরকারই জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হতে চায় না, কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল ছিল যে সরকারের সামনে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প খোলা ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যেহেতু অত্যন্ত জটিল, তাই সরকারের উচিত ছিল আরও আগে থেকেই এই সমস্ত তথ্য ও হিসাব জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা। কারণ, দেশের জনগণ সবসময়ই বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করে, যদি তা সঠিক ও গোছানোভাবে তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
এজেড