বোরহান উদ্দিন
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১২ পিএম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) তাঁর নিউইয়র্ক পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরদিন থেকেই বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক ব্যস্ততা শুরু হবে তার। সফরের মূল আকর্ষণ হিসেবে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণ দেবেন। বক্তব্যের মূল উপজীব্য হবে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার।
পররাষ্ট্র সচিবের দেওয়া তথ্যমতে, নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত তবে অর্থবহ রাখা হয়েছে। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে মোট পাঁচটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন।
এ ছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশ দুটি বিশেষ সাইড ইভেন্টেরও আয়োজন করছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৩৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিউইয়র্ক সফরে আসছে। সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং সরকারের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব গোলাম মহিউদ্দিন। কর্মসূচি শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই এই সরকারের প্রথম সরাসরি অংশগ্রহণ, যা বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার বড় সুযোগ।
বিশেষ করে, এবারের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যা বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, বহুপক্ষীয় সফরের কর্মসূচিতে অনেক সময় অনেক কিছুই যোগ-বিয়োগ হতে পারে। তাছাড়া বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় প্রবাসী ও নেতাকর্মীরা
এদিকে কয়েক বছর পর তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চলছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি। তারা প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।
এ বিষয়ে শনিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে আড্ডা রেস্টুরেন্টে এক মিট দ্য প্রেসে বিস্তারিত জানিয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন। তিনি প্রস্তুতি প্রসঙ্গে বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানাতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেট বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল ও সরাসরি একাধিক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আশা করি জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নামবে। তবে সবাইকে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার অনুরোধ রইল।
এদিকে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন ও কুইন্সের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, সাধারণ প্রবাসী এবং দলীয় নেতাকর্মীদের আড্ডায় এখন প্রধান আলোচনার বিষয় তারেক রহমানের আগমন।
সফরটি স্মরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে বেশ কয়েকটি প্রস্তুতি সভা ও কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে নিউইয়র্কসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এক উৎসবমুখর আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশাল জমায়েত করে তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যবসায়ী, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিসরে পৃথক মতবিনিময় সভার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির শীর্ষ নেতারা জানান, তারা এই সফরকে কেবল রাজনৈতিক সমাবেশ হিসেবে দেখছেন না, বরং মার্কিন নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির কাছে বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনার চিত্র তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে আমাদের প্রস্তুতি শেষ। এবার তাকে স্বাগত জানানো ও বরণ করে নেওয়ার পালা। ইনশাআল্লাহ জেএফকে বিমানবন্দরে হাজারো নেতাকর্মীর ঢল নামবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য মিজানুর রহমান ভুঁইয়া মিল্টন বলেন, দলীয় মতাদর্শের বাইরেও বহু সাধারণ প্রবাসী নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে ইতিমধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, ওয়াশিংটন ডিসি, বাফেলো, মিশিগান, টেক্সাস, জর্জিয়াসহ বিভিন্ন প্রদেশ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অনেক নেতাকর্মী নিউইয়র্কে পৌঁছে গেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, আমাদের নেতা ও বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ বিশ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মঞ্চে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। তাকে স্বাগত জানানোর জন্য আমরা অপেক্ষায় আছি।
ফ্লোরিডা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমরানুল হক চাকলাদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর নানা কারণে মাইলফলক হয়ে থাকবে। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও সম্মানের।
নিউইয়র্ক দক্ষিণ মহানগর বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান সেলিম রেজা বলেন, তারেক রহমান এখন শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান নন। তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী। তার সফর ঘিরে প্রবাসীদের মধ্যে উদ্দীপনা একটু বেশিই। তবে তাকে স্বাগত জানাতে দলীয়ভাবে যা করার সবই হয়েছে।
এ বিষয়কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাফেলো বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সোহেল আহমদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেবেন, আবার এই অধিবেশনে বাংলাদেশ সভাপতিত্ব করছে।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তোফায়েল লিটন চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান বিশ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসছেন। তিনি প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে ভাষণ এবং বাংলাদেশ সভাপতিত্ব করার বিষয়টি আমাদের জন্য একদিকে যেমন বিরল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অন্যদিকে তেমনি বিশেষ মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়।
বিইউ/এআর