নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রায়ের ৩০ দিন পর বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে সরকার।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজার রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রায়ের পর আইন অনুযায়ী ৩০ দিন পর্যন্ত আপিলের সময়সীমা থাকে। এই ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নেই। কিন্তু ৩০ দিন পার হওয়ার পর এই রায় বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের আইনগত কোনো বাধা থাকবে না।’
এদিন ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণার পাশাপাশি শীর্ষ পাঁচ নেতার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক (৫০ শতাংশ) বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণ প্রদান
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ‘রোম স্ট্যাটিউট’-এ দোষী ব্যক্তির ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবং ট্রাইব্যুনালের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার (ইনহারেন্ট পাওয়ার) বলে এই ৫০ শতাংশ সম্পদ রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই রায় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সরকার খুঁজে বের করবে কার কোথায় কী সম্পদ আছে। সে অনুযায়ী প্রাপ্ত সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত হবে। সুনির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে যে, বাজেয়াপ্ত সম্পদ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার দ্বারা বিক্রি করে সেই অর্থ জুলাই-আগস্টে আহত ও নিহতদের পরিবারের মধ্যে বিলিবণ্টন করা হবে।’
আগের রায়গুলোতেও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশের বিষয়ে আজকের এই রায়কে সরকার দৃষ্টান্ত হিসেবে অনুসরণ করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
‘পলাতকদের বক্তব্য আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়’
দণ্ডিত সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক। ওবায়দুল কাদের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন এবং মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ কেউ কেউ অজ্ঞাত স্থান থেকে ফেসবুক লাইভে এসে ট্রাইব্যুনালের বিচার ও এর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন—এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আসামিরা যদি এ ধরনের মন্তব্য করে থাকেন, তবে বুঝতে হবে তারা জেনেশুনেই পলাতক। তারা অপরাধ করেছেন বলেই পালিয়েছেন। বিচারকার্য চলমান থাকা সত্ত্বেও তারা ট্রাইব্যুনালে এসে আইনি প্রক্রিয়ার মোকাবিলা করেননি। এই পলাতক থাকা অবস্থায় যেকোনো বক্তব্য আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।’
আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের সুনির্দিষ্ট লোকেশনের তথ্য এখনও আমাদের কাছে নেই। তবে যেহেতু তারা এখন দণ্ডপ্রাপ্ত, তাই তাদের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বিচারে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম জানান, আইন অনুযায়ী সব আনুষ্ঠানিকতা মেনেই বিচারকাজ শুরু হয়েছে। শুরুতে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য ‘স্টেট ডিফেন্স’ আইনজীবী নিযুক্ত করা হয়। প্রায় ৩০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং পলাতক আসামিদের সব আইনি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
যেসব কারণে সর্বোচ্চ সাজা
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ ছিল, যার অধিকাংশই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন হিসেবে নির্দেশনার দায়) এবং ব্যক্তিগত দায়—উভয়ই প্রমাণিত হয়েছে।
দণ্ডিতদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রসিকিউটর বলেন, ‘গত ১৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে এই আসামিদের উপস্থিতি ছিল এবং সেখানে তারা কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেয়। ওবায়দুল কাদের অত্যন্ত ভয়াবহ একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন—‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলি এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল ওয়েপন) ব্যবহার করার। সেই নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই মারণাস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’
এর আগে ১১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা মারো না কেন? মারো’। এই উসকানিমূলক নির্দেশের পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ ও ওয়াসিমসহ তিন-চারজন শহীদ হন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের সাহেব এটাও বলেছিলেন যে, আন্দোলন দমন করার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তাদের এসব উসকানিমূলক বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের কারণে ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন আজ্ঞাবহ কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ একত্রে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করে এবং ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে।’
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘আসামিদের নির্মম ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের কারণে অসংখ্য মানুষ আজ স্বজনহারা এবং বহু পরিবার আহত-পঙ্গু সদস্যদের নিয়ে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় বসবাস করছে। প্রতিটি ঘটনা সাক্ষ্য-প্রমাণে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই আজকের এই রায় এসেছে।’
আরএনবি/এআর