নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১২ পিএম
বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অভাব নেই, তবে তাদের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, দেশে থাকা অবস্থায় গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ না পেলেও একই শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে মানসম্মত গবেষণা ও প্রকাশনা করছেন। ফলে সমস্যাটি মেধার নয়, বরং গবেষণার সুযোগ ও সহযোগিতার।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ‘স্টেম ফর আ ফিউচার-রেডি বাংলাদেশ: বিল্ডিং দ্য ব্যাকবোন অব দ্য ইনোভেটিভ ইকোনমি’ শীর্ষক প্লেনারি আলোচনার ‘ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশন’ পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের প্রসঙ্গ তুলে মাহদী আমিন বলেন, ‘সীমাবদ্ধতা যদি না থাকে, তাহলে এত এত মেধাবী মানুষ থাকার পরেও আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলোর র্যাংকিংয়ের এ অবস্থা কেন? তার মানে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়নি। আমাদের রিসার্চ কালচার নেই।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক ভালো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে গবেষণার মানসিকতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগও নিশ্চিত করা যায়নি। একজন শিক্ষার্থী দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভালো ফল করে বিদেশে গিয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি করছেন। সেখানে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন, মানসম্মত জার্নালে তার গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ দেশে থাকার সময় সেই শিক্ষার্থী একই ধরনের সুযোগ পাননি।
গবেষণার এই ঘাটতি কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের বড় একটি উৎস সাবেক শিক্ষার্থীদের এনডাওমেন্ট ও অনুদান, বিভিন্ন গবেষণা গ্র্যান্ট এবং কোম্পানিগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল।
নিজের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, সেখানে প্রতিবছর সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কাজে অর্থের প্রয়োজন হলে অ্যালামনাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে অনুদান আহ্বান করা হয়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে গবেষণা ও উন্নয়নে সহযোগিতা নিতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সফল উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হয়েছেন, তাদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মাহদী আমিন বলেন, ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি গবেষণা। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্প খাতের বিভিন্ন স্তরে গবেষণার সংস্কৃতির ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তিগত পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত ভোক্তা, সৃষ্টিকারী নয়। এ কারণে দেশে গবেষণানির্ভর কোম্পানির সংখ্যাও তুলনামূলক কম।
শিল্প খাতে গবেষণার চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা, দুই জায়গাতেই ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার সংস্কৃতি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার চাহিদাও তৈরি হবে না। এটি গবেষণার ‘ডিমান্ড সাইড’। অন্যদিকে ‘সাপ্লাই সাইডে’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজও যথেষ্ট হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় জার্নালে প্রবেশাধিকার নেই। কোথাও পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা নেই। গবেষণাগার ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর এবং জার্নালে গবেষণা প্রকাশের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির গবেষণা কার্যক্রম বাংলাদেশে আনার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, শিল্প খাতের দিক থেকে গবেষণার চাহিদা বাড়াতে হবে, আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। দুই দিকেই একসঙ্গে কাজ করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার মতে, রাজশাহী, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো এলাকায় হাইটেক পার্ক, ইনোভেশন পার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বিসিক শিল্পনগরী থাকলে সেখানকার ব্যবসা ও শিল্পের সমস্যাগুলো কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে কি না, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়েও শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারে।
সরকারেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে স্বীকার করে মাহদী আমিন বলেন, সরকার গবেষণা ও ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের মেধা ও সক্ষমতা রয়েছে। দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণেরও বড় সুযোগ রয়েছে। ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশ এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগও থাকবে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
এমএইচ/এআর