নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম
দেশে ডিজিটাল সেবার বিস্তার দ্রুত বাড়লেও এসব সেবা ব্যবহারে এখনো বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, পরিবহন, বিচারিক সেবা ও সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও রয়েছে প্রবেশগম্যতার ঘাটতি। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব নাগরিকের জন্য ডিজিটাল সেবা সহজলভ্য ও ব্যবহারযোগ্য করতে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ভবনে ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আয়োজিত জাতীয় প্রচার সভায় এসব দাবি জানান।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টেলিয়ন টেকব্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভিআইপিএসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান আমিত। ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি সভাটির আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ক্রিশ্চিয়ান এইড।
সভায় জানানো হয়, ছয়টি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মোট ১০৭টি প্রবেশগম্যতা সমস্যা পাওয়া গেছে। প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথম আলোর মোবাইল অ্যাপ, পূবালী ব্যাংকের ওয়েবসাইট, নগদ মোবাইল অ্যাপ, পাঠাও মোবাইল অ্যাপ, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ওয়েবসাইট এবং পারিবারিক ই-কোর্ট ওয়েবসাইট।
নিরীক্ষায় সমস্যাগুলোকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১০৭টি সমস্যার মধ্যে ১২টি গুরুতর, ৬২টি উচ্চ, ৩২টি মাঝারি এবং একটি ছিল নিম্ন ঝুঁকির। ফলে গুরুতর ও উচ্চ ঝুঁকির সমস্যা মিলিয়ে মোট ৭৪টি সমস্যা পাওয়া গেছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করা কঠিন বা অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
আশিকুর রহমান আমিত বলেন, ডিজিটাল সেবা তৈরির সময় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে শুরু থেকেই প্রবেশগম্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সেবা কেনার পর্যায় থেকে শুরু করে নকশা, উন্নয়ন, পরীক্ষা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এটি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পরে বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করলে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল সেবায় সমান, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। ডিজিটাল সুশাসন ও সেবার মানের একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে প্রবেশগম্যতাকে বিবেচনা করা উচিত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারার বাইরে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ডিজিটাল সেবা থেকে তাদের বাদ পড়ার বিষয়টিও জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় বাধা। অন্তর্ভুক্তিমূলক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) সচিব আবু সায়েদ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ডিজিটাল অধিকার নিশ্চিতে নিজের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল সেবা মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য তৈরি হলেও প্রবেশগম্যতার ঘাটতির কারণে সমাজের একটি বড় অংশ যদি এসব সেবা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে ডিজিটাল উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ডিজিটাল সেবা আরও সহজ ও ব্যবহারযোগ্য করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নতুন কোনো ডিজিটাল সেবা চালুর ক্ষেত্রে শুরু থেকেই প্রবেশগম্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। শুধু সেবা চালু করাই নয়, সেটি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারছেন কি না, তা নিয়মিতভাবে যাচাই করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আবু সায়েদ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ডিজিটাল সেবা উন্নয়ন, সরকারি ক্রয়, প্রযুক্তি নির্বাচন ও সেবা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজ অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও ভূমিকা রাখার আশ্বাস দেন।
ভিআইপিএসের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসাইন মজুমদারের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন , মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক শেখ গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, ভিআইপিএসের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আল আমিন, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের পরিচালক গোলাম রব্বানী, ফ্রেন্ডশিপের উপমহাব্যবস্থাপক নুসরাত জেরিন জয়া প্রমুখ। এতে প্রায় ৮০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, ডিজিটাল উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে প্রবেশগম্যতার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। নকশা ও উন্নয়নের পর কোনো সেবাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়ার বদলে শুরু থেকেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-তে প্রবেশগম্যতার বিষয়টি থাকলেও বর্তমান প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় ডিজিটাল প্রবেশগম্যতার বিস্তারিত প্রয়োজনীয়তা এতে যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে ডিজিটাল পণ্য, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে আলাদা ও সমন্বিত আইন বা কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন।
তারা বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। তথ্য, সরকারি সেবা, আর্থিক লেনদেন, চিকিৎসা, শিক্ষা, সংবাদ ও বিচারিক সেবাসহ দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখন ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব সেবা যদি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতি সমাজের একটি বড় অংশের জন্য নতুন বৈষম্য তৈরি করবে। ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়, এটি সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য তথ্য খোঁজা, আর্থিক সেবা ব্যবহার, সেবা পরিচালনা, তথ্য বোঝা কিংবা সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা জরুরি।
বক্তারা আরও বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রবেশগম্যতাকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি-বেসরকারি সব ডিজিটাল সেবা চালুর আগে প্রবেশগম্যতা যাচাই, নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্ল্যাটফর্মে ইতোমধ্যে সমস্যা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে কোনো নাগরিক যাতে প্রতিবন্ধিতার কারণে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তারা।
এএইচ/জেবি