Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকার সারাদেশে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য সুলতানা আহমেদের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস–সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।

এছাড়া ২০৩০-২০৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খনন, ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি–২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কমবেশি দৈনিক গড়ে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস–সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

1
সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প

এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহসক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।

ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে চাইলে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

ইতিমধ্যে সেখানে গ্যাসনির্ভর কিছু শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এর ফলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার।

৫ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প পাবেন কৃষকরা

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেচ কাজে ডিজেলচালিত পানির পাম্পের পরিবর্তে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্নোত্তর পর্বে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্যের প্রশ্ন ছিল, সেচ কাজে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের পরিবর্তে কৃষকদের বিনামূল্যে সোলার বিদ্যুৎ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?

উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, যেসব স্থানে ডিজেল দিয়ে পানির পাম্প চালানো হয়, সবগুলোকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আমরা সৌর বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে যাবো।’

মাঠ প্রশাসনকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ

মাঠ প্রশাসনকে অধিকতর জনবান্ধব, স্বচ্ছ, দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে সরকার বিদ্যমান নীতি ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

মো. নূরুল ইসলাম প্রশ্ন রাখেন, মাঠ প্রশাসনকে আরও বেশি জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকারের বিদ্যমান নীতিমালার কোনো সংস্কার বা আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কি না?

উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে বর্তমানে সেবা সহজীকরণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, পরিদর্শন ও তদারকি, গণশুনানি কার্যক্রম, তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

2
চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা

তিনি বলেন, ‘এরই অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে সেবা সহজীকরণ নির্দেশিকা ২০২৬ এবং সরকারি দফতরের ওয়েবসাইট নির্দেশিকা, ২০২৬ এবং জেলা প্রশাসকদের কার্যক্রম মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।’

এছাড়া ডি-নথি, আইবাস, ই-নামজারি, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা, ই-জিপি, অনলাইন জিডি, ই-রিটার্ন, ই-পর্চা, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় এবং হেল্পলাইন নাম্বার ৯৯৯, ৩৩৩-সহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ 

সংসদ অধিবেশনে আজ বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রশ্নোত্তর পর্বে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে নগরের ২৫টি খাল থেকে আবর্জনা ও মাটি উত্তোলনসহ ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার সার্ভিস ড্রেন পরিষ্কার, ড্রেনে জমে থাকা মাটি ও আবর্জনা অপসারণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া নগরীর ৩২টি খাল থেকে আবর্জনা ও মাটি উত্তোলন এবং অপসারণের কার্যক্রম চলছে।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে বাস্তবায়নাধীন জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ৩৬টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্পের বাইরে আরও ২১টি খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে।

বুধবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য আটটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে তিনটি প্রশ্ন এবং সাতটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তর দেন সরকারপ্রধান।

এএইচ