নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইমরান হোসেন নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া গত ৫ সেপ্টেম্বর (শনিবার) রাজধানীর কদমতলীতে দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ী আসলাম খানকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনায় সন্ত্রাসীরা আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করতে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী।
তিনি জানান, যাত্রাবাড়ীর ধলপুরের ঘটনায় কথিত মূলহোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচ রাউন্ড তাজা গুলি, ছয়টি ককটেল, তিনটি চাইনিজ কুড়াল, দুটি চাপাতি, দুটি সুইচ গিয়ার চাকু ও একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- রিয়াজুল ইসলাম ওরফে রিয়াজ ওরফে কাইল্লা রিয়াজ, কামরুল হাসান, মোহাম্মদ সাইফুল হোসেন, জামিল মিয়া ওরফে দোলন এবং মিঠু ওরফে ডোবার মিঠু।
এছাড়া রাজধানীর কদমতলীতে দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ী আসলাম খানকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি রিভলভার, ৯ রাউন্ড তাজা গুলি ও একটি পিস্তলের ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও একটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- মনজুরুল ইসলাম, ইকবাল, কালু, আকলিমা আক্তার রুনিয়া ও সোনিয়া ইয়াসমিন।
মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ৮টার দিকে কদমতলী থানার জিয়া সরণির মেসার্স লাকি ক্রোকারিজে ঢুকে দোকানের মালিক মোহাম্মদ আসলাম খানকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। হামলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যায়।
গুলিতে আসলাম খানের মুখের ডান পাশ ও বাম হাতের কনুইতে লাগে। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকে মনজুরুল ইসলাম নামে একজনকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই কদমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইকবাল ও কালুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে দক্ষিণখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে আকলিমা আক্তার রুনিয়া ও সোনিয়া ইয়াসমিনকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামলার সময় ঘটনাস্থলে মোট ছয়জন ছিল। এর মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি দুজনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। গ্রেফতার সোনিয়া ইয়াসমিন ও রুনিয়া অস্ত্রের ‘ক্যারিয়ার’ হিসেবে কাজ করেছেন। তারা ভ্যানিটি ব্যাগে করে অস্ত্র ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। হামলার আগে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকও করেন। উত্তরখান থেকে অস্ত্র নিয়ে এসে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সবাই একত্রিত হওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে যায় চক্রটি।
পুলিশের তদন্তে হামলার পেছনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী আসলাম খান ও তার সহযোগীদের কেনা একটি জমি দীর্ঘদিন ধরে জলিল মণ্ডলের দখলে ছিল। এ নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলার পর আদালতের রায় পান আসলাম খান। পরে গত ১৭ আগস্ট ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে জলিল মণ্ডলকে উচ্ছেদ করে আসলাম খানকে ওই জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের ধারণা, জমির দখল হারানোর ক্ষোভ থেকেই আসলাম খানকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে হামলা চালিয়েছে। ঘটনাটি শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়, প্রাথমিক তদন্তে আসলাম খানকে হত্যার উদ্দেশেই গুলি করা হয়েছিল। খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। হামলার সময় আসলাম খানও প্রতিরোধের চেষ্টা করেন।
এ ঘটনায় কদমতলী থানায় মামলা করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও দুজন এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধের মূল ব্যক্তি জলিল মণ্ডলকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
পাশাপাশি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন,৬ সেপ্টেম্বর (রোববার) রাত সাড়ে ১০টায় যাত্রাবাড়ীর ধলপুরের বাদল সরদার গলিতে শরীফের গাড়িতে বসে ছিলেন ইমরান ও সাদ্দাম। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলে করে হেলমেট ও মাস্ক পরা একদল দুর্বৃত্ত সেখানে গিয়ে তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়েও তাদের ওপর হামলা করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইমরান নিহত হন। গুরুতর আহত সাদ্দাম বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় নিহত ইমরানের স্ত্রী বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে নেমে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। এর ধারাবাহিকতায় ৮ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার গেন্ডারিয়াবাগ এলাকা থেকে মামলার মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত রিয়াজুল ইসলাম ওরফে রিয়াজ ওরফে কাইল্লা রিয়াজকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি জানান, রিয়াজের হেফাজত থেকে একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচ রাউন্ড তাজা গুলি ও একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, উদ্ধার করা পিস্তলটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে। পরে রিয়াজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বিছানার নিচ থেকে একটি চাইনিজ কুড়াল উদ্ধার করা হয়।
রিয়াজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন ডেমরা থানাধীন পাঠানডোগাই এলাকা থেকে কামরুল হাসান ও মোহাম্মদ সাইফুল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে ছয়টি ককটেল, দুটি চাইনিজ কুড়াল, দুটি চাপাতি ও দুটি সুইচ গিয়ার চাকু উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া ৮ সেপ্টেম্বর মিঠু ওরফে ডোবার মিঠুকে ৭০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। পরদিন অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত জামিল মিয়া ওরফে দোলনকে গ্রেফতার করা হয়।
অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় অস্ত্র আইনে এবং ককটেলসহ অন্যান্য বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ডেমরা থানায় পৃথক মামলা হয়েছে। মিঠুর কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক মামলা হয়েছে। হত্যা মামলাসহ এ ঘটনায় মোট চারটি মামলা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। রিয়াজুল ওরফে কালিয়া রিয়াজের বিরুদ্ধে ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি ও ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা রয়েছে। মিঠু ওরফে ডোবার মিঠুর বিরুদ্ধে মাদক ও ডাকাতির প্রস্তুতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
ধলপুর এলাকায় আগে সন্ত্রাসী লিটন ওরফে শুটার লিটনের নেতৃত্বে মাদক স্পটগুলো নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল। লিটন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার সহযোগী খাকি বাবুকেও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শুটার লিটন ও খাকি বাবু কারাগারে যাওয়ার পর ওই এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইমরান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
এ ঘটনায় আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলছেন, তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে গ্রেফতারদের কাছে আরও কোনো অস্ত্র রয়েছে কি না, সেগুলোও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
একেএস/এএইচ