নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)।
একই সঙ্গে ব্যবহৃত ইভি আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের বয়সসীমা এবং ব্যাটারির ন্যূনতম স্টেট অব হেলথ (এসওএইচ) ৭০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরে বারভিডা।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার সভাপতি আবদুল হক বলেন, গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের তুলনামূলক কম দামে নতুন প্রযুক্তির গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম এখনো মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে। রিকন্ডিশন্ড ইভি তুলনামূলক কম দামে বাজারে পাওয়া গেলে সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহারও দ্রুত বাড়বে।
বারভিডা জানায়, ২০০৯ সালে শুল্ক সুবিধাসহ নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি আমদানির সুযোগ ছিল না। পরে সংগঠনটির বিভিন্ন উদ্যোগ ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এর ফলে দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গাড়ির বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর, জর্জিয়ায় ছয় বছর, কেনিয়ায় আট বছর এবং সৌদি আরবে পাঁচ বছর পর্যন্ত পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ রয়েছে। নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডেও নির্দিষ্ট বয়সসীমা ছাড়াই শর্তসাপেক্ষে ইভি আমদানির সুযোগ রয়েছে বলে জানায় বারভিডা।
বারভিডার প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। আমদানি করা গাড়ির ব্যাটারির ন্যূনতম স্টেট অব হেলথ (এসওএইচ) ৭০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।
ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমদানির আগে অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে ইভি পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। পাশাপাশি বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, গুরুতর দুর্ঘটনা বা কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ইভি আমদানি নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে সংযোজিত, উৎপাদিত ও আমদানি করা নতুন ইভির ব্যাটারির আয়ুষ্কাল সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
ব্যবহৃত ইভি ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর কাঠামো প্রণয়নেরও প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। সংগঠনটির মতে, দেশে ইভির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদে নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
চার্জিং স্টেশন, গাড়ি মেরামত, ব্যাটারি পরীক্ষা ও পুনর্ব্যবহার খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে শুল্ক ও কর সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রিতভাবে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং ইভি প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বারভিডা আরও বলছে, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে। একই সঙ্গে ইভির বাজার সম্প্রসারণ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোটরযান খাতে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও তা সহায়ক হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা জানায়, গত ৭ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শিক্ষার্থী, সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে শুল্ক-কর প্রত্যাহার করে। তবে এখন পর্যন্ত ওই সুবিধার আওতায় উল্লেখযোগ্য আমদানির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি সরকারের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।
এ সময় আবদুল হক বলেন, ‘আমরা সরকারের নীতির বিরোধিতা করছি না। এই শিল্পের জন্য আমাদের চাওয়া বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী নীতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি নিষেধাজ্ঞা বাজারকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একটি সঠিক নীতি একটি শিল্পকে গড়ে তুলতে পারে।’
চলতি বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য নির্ধারিত মূল্যস্তরভিত্তিক শুল্ক ও কর কাঠামো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাসের আহ্বান জানিয়েছে বারভিডা। পাশাপাশি শুল্ক কাঠামোর বিভিন্ন স্তর পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।
সবশেষে নির্দিষ্ট সময় পর ইভি আমদানি নীতির ফলাফল মূল্যায়ন করে বয়সসীমা ও অন্যান্য শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। সংগঠনটির মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে নিরাপদ ও মানসম্মত ইভি আমদানি নিশ্চিতের পাশাপাশি দেশে চার্জিং অবকাঠামো, গাড়ি মেরামত, ব্যাটারি পরীক্ষা ও পুনর্ব্যবহার খাতে বিনিয়োগ বাড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান চৌধুরী, সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হক চৌধুরী, হাবিবুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিবুল ইসলাম, সহ-সভাপতি হাবিবুর, ফরিদসহ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতারা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
এমআর/এআরএম