নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম
দেশে গ্যাস সরবরাহ কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থার মাধ্যমে চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে জনগণের দুর্ভোগের জন্য সরকার সমব্যথী বলেও উল্লেখ করেন উপদেষ্টা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর)) রাজধানীর রমনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
‘বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে স্থিতিস্থাপক জ্বালানি রূপান্তরের পথে’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে বিআইআইএসএস।
অর্থ উপদেষ্টা, জনগণের প্রতি সরকারের সহানুভূতি রয়েছে। তবে বাস্তবতা আড়াল করে কোনো ‘মিরাকল ন্যারেটিভ’ তৈরি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা বা অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি সরকারের সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। দেশের জ্বালানি খাতকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তার ওপরও জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করে।
দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে সরবরাহ রয়েছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে দেশীয় উৎস থেকে। আর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে আবেদনকৃত গ্রাহকদের চাহিদা হিসাব করলে দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা ৫ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়াবে। এই বাড়তি চাহিদা পূরণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিতুমীর।
তিনি বলেন, মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলে ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে চলমান সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনাও প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।
সেমিনারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি জানান, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসতে পারে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর আগে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।
দেশে জ্বালানি মজুত পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১৭ দিনের ডিজেল মজুত ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে ৩২ দিনে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে ৯০ দিনের ডিজেল মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সরকার।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান উপদেষ্টা। আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির সঙ্গে সোলার প্যানেল স্থাপনের একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। খালের ওপর সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে কৃষিজমির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে পানির বাষ্পীভবনও কমানো যাবে। এভাবে প্রতি কিলোমিটার খাল থেকে সর্বোচ্চ ৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে বলে।
সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার বিষয়টিও উঠে আসে। এসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ২০০০ সালের দিকে দেশে জ্বালানি উৎপাদন ও আমদানির মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য ছিল। পরবর্তী সময়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে দেশে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা ছিল ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে আমদানিনির্ভরতা ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
উন্মুক্ত আলোচনায় জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, সাবেক কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। আলোচনায় দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট, আমদানিনির্ভরতা, মজুত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে মতামত তুলে ধরা হয়।
এএইচ/এএইচ