Dhaka Mail Logo

জাতীয়

ত্রিপলের ঝুপড়ি ঘরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর প্রহর গুণছেন বৃদ্ধ

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

একসময় অন্যের ঘর নির্মাণ করে জীবিকা চালাতেন ৭০ বছরের বেশি বয়সী সাইদুল হক। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় কোমর ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর বদলে গেছে তাঁর জীবন। প্রায় দুই বছর ধরে ঢাকার একটি ঝুপড়ি ঘরে বিছানাবন্দি তিনি। অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে এখন ব্যথানাশক ওষুধ আর মানুষের সামান্য সহায়তাই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন।

টিন ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ছোট্ট ঘর। স্যাঁতস্যাঁতে মাটির ওপর কাঠের পাটাতন। সেখানেই বিছানায় শুয়ে দিন-রাত কাটে সাইদুলের। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে বিছানাতেই মলমূত্র ত্যাগ করতে হয় তাঁকে। নিজের যত্ন নেওয়ার মতো কেউ নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থাও হয়নি দীর্ঘদিন। রাজধানীর শনির আখড়ায় জাপানি বাজার স্মৃতিধারা ৫ নম্বর সড়কে খোলা আকাশের নিচে ত্রিপলের ঝুপড়িতে কাটছে ৭০ বছরের বৃদ্ধ সাইদুল হকের দিন।

বিছানায় শুয়ে পথচারী কিংবা আশপাশের মানুষকে প্রায়ই অনুরোধ করেন তিনি, ‘আমাকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। আজ নিয়ে যায়, কাল নিয়ে যায়—এভাবেই দিন চলে যাচ্ছে।’

image

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় দুই বছর আগে নির্মাণকাজের সময় উঁচু মাচা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন সাইদুল। এরপর থেকেই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না তিনি। ধীরে ধীরে বিছানাই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র আশ্রয়।

বর্তমানে প্রতিবেশীদের দেওয়া ১০ থেকে ২০ টাকা এবং আশপাশের কয়েকটি বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে পাওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করেই তাঁর দিন কাটে।

সাইদুলের ভাষায়, ‘মানুষ কিছু দিলে খাই, না দিলে না খাই। আমার আপন বলতে দুনিয়াতে কেউ নাই।’

তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন নির্মাণকাজে কাজ করা এক সহকর্মী জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই সাইদুল চরম কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। অর্থের অভাবে তাঁর উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সাইদুল হকের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। এলাকাবাসী নানাভাবে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছি না।’

image

জানা যায়, নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার বাসিন্দা সাইদুল কর্মসূত্রে কুষ্টিয়ায় বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান বা ছেলেসন্তান রয়েছে (প্রতিবেদনে ছেলে বলা হয়েছে)। তবে সেই দাম্পত্য জীবন টেকেনি। বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। বর্তমানে তাঁর পাশে নেই কোনো স্বজন। খোঁজ নেওয়ার মতোও নেই আপনজন।

দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীনতা ও একাকিত্বের প্রভাবও পড়েছে তাঁর আচরণে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি কখনো একই কথা বারবার বলেন, আবার কখনো অতীত ও বর্তমানের ঘটনা গুলিয়ে ফেলেন। শ্রবণশক্তিও অনেকটাই কমে গেছে।

শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি নিঃসঙ্গতাও যেন প্রতিদিন তাঁকে আরও ভেঙে দিচ্ছে। শেষ কবে গোসল করেছেন, সেটিও মনে করতে পারেন না তিনি। শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় অনেকেই তাঁর কাছে যেতে চান না বলে জানান স্থানীয়রা।

ব্যথা বাড়লে কয়েকটি ব্যথানাশক ওষুধই এখন তাঁর একমাত্র ভরসা। তবে এসব ওষুধ সাময়িকভাবে ব্যথা কমালেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

সাইদুলের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, একবার ছেলেকে দেখতে চান। পাশাপাশি সুস্থ হয়ে আবার নিজের উপার্জনে জীবন চালানোর স্বপ্নও দেখেন তিনি।

image

৬০ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব ফখরুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিষয়টি মানবিক। অবশ্যই আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা চন্দন কুমার মিত্র ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে তাঁকে বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’

তবে এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

একসময় নিজের শ্রমে অন্যের ঘর নির্মাণ করেছেন সাইদুল হক। আজ সেই মানুষটিই নিজের জীবন বাঁচাতে অন্যের সহযোগিতার অপেক্ষায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা পেতে পারেন এই অসহায় বৃদ্ধ।

প্রতিনিধি/ইএইচ