নিজস্ব প্রতিবেদক
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ এএম
অনলাইনে ভুল তথ্যের বিস্তার থামছেই না। চলতি বছরের আগস্ট মাসেও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৩৯৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। এসব ভুল তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক বিষয়ক, যার সংখ্যা ২৬০। এটি মোট শনাক্ত ভুল তথ্যের প্রায় ৬৬ শতাংশ।
রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৩৬৭টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ বলছে, আগস্ট মাসে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (২৬০) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৬৬ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৬১টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ২৫টি, খেলাধুলা বিষয়ে ৮টি, শিক্ষা বিষয়ে ৯টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১১টি, বিনোদন বিষয়ে ৪টি, প্রতারণা বিষয়ে ৪টি এবং অন্যান্য বিষয়ে ১৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।
এসব ঘটনায় তথ্য কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৮৭টি। এছাড়া, অডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ২টি, ভিডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১৪৮টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৫৯টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ২৯৮টি, বিকৃত ৪০টি এবং বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৫৮টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে পুরুষদের জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে ২৩৫টি এবং নারীদের জড়িয়ে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ১০০টি।
একই সময়ে বয়সের ধরন অনুযায়ী পুরুষ ও নারীদের চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে ভুল তথ্যগুলোকে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে শিশুদের নিয়ে ১১টি, যুবকদের নিয়ে ৫৫টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৫৪টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ১১৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, নারীদের মধ্যে শিশুদের নিয়ে ৭টি, তরুণীদের নিয়ে ১৭টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৩২টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ৪৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ৩৭০টি। এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ৯৩টি, ইউটিউবে ৪২টি, এক্সে ২৪টি, টিকটকে ৪৯টি, টেলিগ্রামে ৩টি ও থ্রেডসে অন্তত ৭টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ৫০টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। ৩টি ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যমেও বাংলাদেশকে নিয়ে অপতথ্য প্রচার করতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনায়। আগস্ট মাসে ১১টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ৭টি অপতথ্যই ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিএনপি সরকারকে জড়িয়ে গত মাসে ৮৭টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ২৪টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আগস্ট মাসে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ে ৩০টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৯টি, সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) শিকার হয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
রিউমর স্ক্যানার আগস্ট মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৭১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ২৭টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় সবগুলোতেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, ছাত্রদল ও যুবদলকে জড়িয়ে যথাক্রমে ৯ ও ১টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে আগস্ট মাসে ৪৮টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৮৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৬টি অপতথ্য (৮৩ শতাংশ নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ৮টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, আগস্ট মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৩৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে ১০টি অপতথ্য (৮০ শতাংশই নেতিবাচক) প্রচার হতে দেখা যায়। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে ৩টি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে আগস্ট মাসে ১১৭টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ৩৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে ৪২টি অপতথ্য (প্রায় ৮৮ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
আগস্ট মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে ৮টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। একই সময়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জড়িয়ে ২টি ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে জড়িয়ে একটি ভুল তথ্যের প্রচার দেখা গেছে।
আগস্ট মাসে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ৬৭টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ৪টি। সার্কাজম পেজের কনটেন্ট বাস্তব দাবিতে ছড়িয়েছে ৫৫টি।
আগস্ট মাসে দেশে ৭টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে জ্বালানী সংকট ইস্যুতে ৩২টি, নেপালের বন্যা ইস্যুতে ১৪টি, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী ইস্যুতে ৯টি, এসএসসির ফলাফল ঘিরে ৮টি, হবিগঞ্জে এনসিপির ওপর হামলা ঘিরে ৬টি, নারীদের পিংক বাস ইস্যুতে ৫টি ও রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা ইস্যুতে ৪টি ভুল তথ্যের প্রচার ছিল।
গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেতে দেখা যাচ্ছে৷ আগস্ট মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ৪৭টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ১৯টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৪৮টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এমআর