মাহফুজুর রহমান
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৭ এএম
একটি টেবিল। সামনে বসে দুই সেনা কর্মকর্তা। চারপাশে হাজারো মানুষের ভিড়। কয়েক মিনিটের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কাগজে স্বাক্ষর করলেন পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি। পাশে মিত্রবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। মুহূর্তটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, বাংলাদেশের বিজয়।
যে মাঠে এই ঐতিহাসিক দৃশ্যের জন্ম, সেটি তখন পরিচিত ছিল রেসকোর্স ময়দান নামে। অথচ এই মাঠের গল্প শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বহু আগে—ঘোড়দৌড়, অভিজাতদের বিনোদন আর ঔপনিবেশিক ঢাকার এক ভিন্ন অধ্যায় দিয়ে। স্বাধীনতার পর সেই রেসকোর্স ময়দানের নাম বদলে হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
একটি মাঠের নাম বদলের এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুঘল আমলের ঢাকা, ব্রিটিশ আমলের নগরায়ণ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরের রাজনীতি, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়।
ঘোড়দৌড়ের মাঠ থেকে শুরু
আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইতিহাস রেসকোর্স নামকরণেরও আগে শুরু। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মুঘল আমলে বৃহত্তর রমনা অঞ্চল ছিল বাগ-ই-বদশাহীর অংশ। পরে দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে থাকা এই এলাকা উনিশ শতকে নতুন করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৮২৫ সালে ঢাকার তৎকালীন ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডয়েস রমনা এলাকার জঙ্গল পরিষ্কার ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। বাংলাপিডিয়া বলছে, ওই সময় বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা সবুজ এলাকার জায়গায় রেসকোর্স স্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে জায়গাটি রমনা জিমখানা নামেও পরিচিত ছিল। সেখানে ব্রিটিশ সৈন্যদের একটি সামরিক ক্লাব ছিল। পরে ঘোড়দৌড়ের আয়োজনকে কেন্দ্র করে জায়গাটি রমনা রেসকোর্স হিসেবে পরিচিতি পায়।
অর্থাৎ আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রথম পরিচয় রাজনৈতিক ময়দান হিসেবে নয়, ঘোড়দৌড়ের মাঠ হিসেবে।
ঘোড়দৌড় ঘিরে জমেছিল ঢাকার অভিজাত সমাজ
উনিশ শতকে ঘোড়দৌড় শুধু খেলাধুলা ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন ঢাকার অভিজাত সমাজের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম।
ইতিহাসভিত্তিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, নবাব খাজা আলিমুল্লাহর সময় রেসকোর্সে ঘোড়দৌড়ের জনপ্রিয়তা বাড়ে। তাঁর সময় প্রতি জানুয়ারিতে নিয়মিত ঘোড়দৌড়ের আয়োজন করা হতো। ১৮৪৫ সালের একটি চিত্রেও ঢাকার রেসকোর্সে এমন আয়োজনের দৃশ্য পাওয়া যায়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে রেসকোর্সের ব্যবস্থাপনায় ঢাকার ইউরোপীয় ক্লাব সংস্কৃতিও যুক্ত হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪১ সালে ঢাকার তৎকালীন গভর্নর ঢাকা ক্লাবকে ৫২৪ বিঘা জমি ইজারা দেন। এর মধ্যে রেসকোর্স, গলফ কোর্স, ক্লাব ভবন ও খেলার মাঠ ছিল।
তবে রেসকোর্সের সেই জৌলুশ চিরস্থায়ী হয়নি। ১৯৪৯ সালে ঘোড়দৌড় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্যেও এ বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
ঘোড়দৌড় বন্ধ হলেও জায়গাটির গুরুত্ব কমেনি। বরং ধীরে ধীরে রেসকোর্স ময়দান ঢাকার রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ভাষণ
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রেসকোর্স ময়দান পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। তাঁর ভাষাসংক্রান্ত অবস্থান পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এ সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানের নামও জড়িয়ে যায়।
পরবর্তী দুই দশকে জায়গাটি বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশস্থলে পরিণত হয়।
১৯৬৯: যে মাঠে শেখ মুজিব পেলেন বঙ্গবন্ধু নাম
রেসকোর্স ময়দানের ইতিহাসে ১৯৬৯ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে তখন পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র গণআন্দোলন চলছে। ২২ ফেব্রুয়ারি মামলা প্রত্যাহারের পর তিনি মুক্তি পান।
পরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের উদ্যোগে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিশাল সেই জনসভায় তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়গুলোর একটি হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু নামটির জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাই এই মাঠের নাম জড়িয়ে আছে।
৭ মার্চ: রেসকোর্স ময়দান থেকে স্বাধীনতার ডাক
এর মাত্র দুই বছর পর একই মাঠে ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডও জানিয়েছে, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই স্থানেই ৭ মার্চের ভাষণ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে রেসকোর্স ময়দানের এই স্থান বাংলাদেশের ইতিহাস ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক গুরুত্বও লাভ করে।
১৬ ডিসেম্বর: যে মাঠে শেষ হয় পাকিস্তানি শাসনের অধ্যায়
৭ মার্চের মাত্র নয় মাস পর আবার ইতিহাসের কেন্দ্রে আসে রেসকোর্স ময়দান।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে। রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি মিত্রবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্যেও ১৬ ডিসেম্বর রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সৈন্যদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
যে মাঠে একসময় ঘোড়দৌড়ের আয়োজন হতো, সেখানেই সেদিন শেষ হয় পাকিস্তানি বাহিনীর নয় মাসের রক্তাক্ত অধ্যায়।
স্বাধীনতার পর বদলে গেল নাম
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেসকোর্স ময়দানের নামও বদলে যায়। জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে এর নাম রাখা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামানুসারে রমনা রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাখা হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও একই তথ্য রয়েছে।
নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক আমলের ঘোড়দৌড়ের মাঠের পুরোনো পরিচয়ের বদলে জায়গাটির সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
কেন সোহরাওয়ার্দীর নামে?
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি রাজনৈতিক নেতা। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
বাংলার রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকেও সোহরাওয়ার্দীর প্রভাব ছিল।
ফলে স্বাধীনতার পর রেসকোর্স ময়দানের নতুন নাম হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর নাম যুক্ত হওয়া জায়গাটির রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
স্বাধীনতার পরও থামেনি রাজনৈতিক ইতিহাস
নাম পরিবর্তনের পরও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাজনৈতিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ এখানে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্যে এই জনসভার উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ স্বাধীনতার পরও জায়গাটির রাজনৈতিক গুরুত্ব অটুট ছিল।
রেসকোর্স থেকে সবুজ উদ্যান
যেখানে একসময় ঘোড়ার দৌড় চলত, সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গাছপালা, হাঁটার পথ ও সবুজ পরিবেশ। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে এখানে ব্যাপকভাবে গাছ লাগানো শুরু হয়।
ফলে রেসকোর্স নামের সঙ্গে যুক্ত ঘোড়দৌড়ের স্মৃতি ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়। জায়গাটি হয়ে ওঠে রাজধানীর অন্যতম বড় সবুজ উন্মুক্ত স্থান।
স্বাধীনতা স্তম্ভ: ইতিহাসকে স্থায়ী স্মৃতিতে রূপ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্মরণীয় করে রাখতে পরে নির্মিত হয় স্বাধীনতা স্তম্ভ।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো স্মরণে সরকার ১৯৯৬ সালে এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। প্রকল্পটির নকশা করেন স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী ও মেরিনা তাবাসসুম।
স্বাধীনতা স্তম্ভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি সেই জায়গায় নির্মিত যেখানে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর হয়েছিল।
এখানে রয়েছে শিখা চিরন্তনসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণকারী বিভিন্ন স্থাপনা।
নাম বদলেছে, ইতিহাস বদলায়নি
আজকের প্রজন্মের কাছে জায়গাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। অনেকেই হয়তো জানেন না, এই একই জায়গা একসময় রমনা জিমখানা, পরে রমনা রেসকোর্স বা রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল।
স্বাধীনতার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামটিই স্থায়ী পরিচয় হয়ে যায়। সরকারি পর্যটন ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্যেও রমনা রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
একসময় যে মাঠে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দে ঢাকার অভিজাত সমাজের বিনোদন জমত, সেই মাঠেই পরে উচ্চারিত হয়েছে স্বাধীনতার ডাক। আর সেখানেই পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে একটি রাষ্ট্রের জন্মের রক্তাক্ত অধ্যায়।
নাম বদলেছে, সময় বদলেছে, বদলেছে মাঠটির পরিচয়ও। কিন্তু মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ইতিহাসের নাম বদলায়নি।
এম/এআর