নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটি বলেছে, জ্বালানি সংকটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে চুরি, লুটপাট ও অনিয়ম বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, সংকট দূর করতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু চুরি-লুটপাট বন্ধে সময় লাগার কথা নয়।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্যাব কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপ্রাপ্ততা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রাহকের বিল দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অথচ লোডশেডিংয়ের কারণে তারা আগের তুলনায় কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। এটিকে অনিয়ম ও লুটপাট উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে এসব চুরি ও অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি।
তিনি বলেন, ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সংকটের মধ্যে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সরাসরি জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। সরাসরি জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঝুঁকি থাকে। তাই জ্বালানি সংকটের প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
ক্যাব সভাপতি আরও বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে দাম বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। কোনো পণ্যের বাজারের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তারা সরবরাহ কমিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করতে পারে। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
এ সময় তিনি বলেন, অনুমোদিত সীমার বেশি পণ্য মজুত করে কেউ বাজার অস্থিতিশীল করলে সংশ্লিষ্ট গুদামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংকট তৈরি করে যারা জনগণকে জিম্মি করছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি তাদেরই সুবিধা দেবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। বড় ওষুধ কোম্পানির স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করা যাবে না। ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এমন শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি হারে পণ্যের দামে পড়ছে।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের কারণে ভোক্তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ক্যাব সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বরং জনস্বার্থে সরকারের পাশে থেকে অ্যাডভোকেসির ভূমিকা পালন করছে। দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
ক্যাবের কোষাধ্যক্ষ শওকত আলী খান বলেন, ভেজাল বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে। ওষুধ খাতে আগে থেকেই নানা সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে হঠাৎ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিল করায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তালিকাটি পুনর্বহাল করে যৌক্তিক মূল্যে ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ভেজাল ওষুধ ও খাদ্য বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন করে এলএনজি-নির্ভরতা কমাতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ ও মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ভুলনীতি ও দুর্নীতির দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।
তিনি আরও বলেন, দেশে গ্যাসসহ নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, পানি ও বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের যথাযথ অনুসন্ধান ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস সরবরাহ করা না হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের কাছ থেকে বিল নেওয়া বন্ধেরও দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু আগের সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দেখলে হবে না। সংকটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুরো বিল নেওয়া এবং এলপিজি ব্যবসাকে সুবিধা দেওয়ার নীতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, প্রচার সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও নির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্যাবের নির্বাহী পরিচালক আহম্মদ একরামুল্লাহ।
এমআর/এআর