Dhaka Mail Logo

জাতীয়

পানি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত হতে হবে জাতীয় স্বার্থনির্ভর: ড. তিতুমীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ আগস্ট ২০২৬, ০১:০১ এএম

আন্তঃসীমান্ত পানিসহ দেশের পানি–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করাটা কারিগরি বিষয় হলেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

রোববার (৩০ আগস্ট) ঢাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) অনুষ্ঠিত ‘আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন ইস্যু ও পদ্মা ব্যারাজ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং (সিইই) বিভাগ।

সেমিনারে নীতিনির্ধারক, পানি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তা ইস্যু এবং প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দুটি বাস্তবতা রয়েছে- বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট। এ দুই বাস্তবতা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় কারিগরি হতে পারে, কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। আর সেই সিদ্ধান্তে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।

নদীর পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, একটি নদীকে শুধু তার সংখ্যা দিয়ে বোঝা উচিত নয়; বরং তার ইকোসিস্টেম এবং তার সৃষ্ট বিস্তৃত প্রভাবের আলোকে বুঝতে হবে।

তিনি বলেন, নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এর সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবন-জীবিকা ও একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। তাই পানি ও নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শুধু প্রকৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট নয়; এর পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

ড. তিতুমীর বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজকে শুধু একটি প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে দেখলে হবে না। এটি কৃষি, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জাতীয় উন্নয়ন ইস্যু।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকারও জরুরি। পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নদী, পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সরকারের পরিবেশগত অগ্রাধিকার, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, বর্জ্য থেকে সম্পদ সৃষ্টির উদ্যোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, দক্ষ পানি ব্যবহার ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য আন্তঃসীমান্ত পানি বিরোধ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন। তিনি নদী অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, জল-অর্থনৈতিক মডেলিং, সুবিধা বণ্টন এবং দক্ষ পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।

এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান পানি কূটনীতি ও নীতিবিষয়ক উপস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং ন্যায্য ও সহযোগিতামূলক পানি বণ্টনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পানিকে বাণিজ্যিক পণ্য নয়, যৌথ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব প্রকৌশলী এ এন এইচ আখতার হোসেন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান।

আলোচকরা প্রকৌশল জ্ঞান, পরিবেশ সুরক্ষা, আইনি প্রস্তুতি, অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা ও কূটনীতির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ পানি নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা সেচ, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সহায়ক হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সেমিনারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী। তিনি ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সিইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, পানি সম্পদ পরিকল্পনায় বড় ধরনের হস্তক্ষেপের আগে নদীর মৌসুমি পরিবর্তন, পলি জমা ও বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক এস. কে. তৌফিক এম. হক এবং পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বক্তব্য দেন।

/এএস