Dhaka Mail Logo

জাতীয়

আন্তর্জাতিক গুম দিবস: আওয়ামী আমলের লোমহর্ষক তথ্য ও নতুন অভিযোগের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ। গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, স্মরণ এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসটি পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনের পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুমের লোমহর্ষক কাহিনীগুলো সামনে আসায় এবারের দিবসটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

গুমকে ‘মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ’ উল্লেখ করে গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুম আসলে মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ। মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশ করতে পারেন এবং দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না সে কোথায় আছে। তারা আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক স্থগিত অবস্থায় সামাজিক কলঙ্ক ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়।

আওয়ামী সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের অভিযোগ তদন্তে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিশন গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬-এ অন্তবর্তকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনা গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।

কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে। অনেকে ভয়ে বা অন্য দেশে চলে যাওয়ায় এখনও অনরেকর্ড কথা বলছেন না। তদন্তে দেখা গেছে, বলপূর্বক গুমের পেছনে মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে জীবিত ফেরা ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মী।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। শেখ হাসিনা নিজেই অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। লাশ গুমের জন্য বরিশালের বলেশ্বর নদী, বুড়িগঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জকে ব্যবহার করার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দিবসটি উপলক্ষে বলেন, প্রত্যেকটি গুমের ঘটনার ন্যায়বিচার আমরা নিশ্চিত করবো। গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, আমরা তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করবো। সমাজের যত বড় ব্যক্তিই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ (আইসিপিপিইডি) শীর্ষক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে গুম প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার পথে হাঁটে বাংলাদেশ।

বিগত সরকারের পতন হলেও গুমের ছায়া পুরোপুরি কাটেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্টগার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩০) নামে এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর গত তিন মাসেও তার খোঁজ মেলেনি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ব্লাস্ট এবং এইচআরএসএস একে বর্তমান সরকারের আমলের প্রথম গুমের ঘটনা বলে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্টও। যদিও কোস্টগার্ড বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বর্তমান সরকারও গুমের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন বলেন, আমি নিজে দেখছি কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে নিয়া গ্যাছে। এহন তারা অস্বীকার করে। আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। মিরাজ শেখের বিষয়ে তিনি বলেন, মিরাজ শেখের রেকর্ডও সেই রকম। তার বাবা ও দাদার রেকর্ডও একই রকম। তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি এসেছে।

সত্তরের ও আশির দশকে লাতিন আমেরিকার সামরিক একনায়কতন্ত্রের সময় গুমের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই থেকে এই দিবসের উৎপত্তি। ১৯৮১ সালে কোস্টারিকাভিত্তিক সংগঠন ‘ফেডেফাম’  প্রথম এই দিবসটির প্রস্তাব করে। পরে ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২০১১ সাল থেকে এটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া এই সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করবে বলে তারা আশা করছেন।

আরএনবি/এআরএম