ঢাকা মেইল ডেস্ক
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
২০২৫ সালে গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধ্যাদেশটি সংসদে অনুমোদন না হওয়ায় সেটি কার্যকারিতা হারায়। পরে বিষয়টি আরও যাচাই-বাছাই করে গুমসংক্রান্ত নতুন আইন আনার কথা জানায় সরকার।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তবে বিলটির খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই এটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে গুমসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পৃথক কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে রাখার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
তাদের প্রশ্ন, গুম প্রতিরোধ এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে নতুন আইনটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে?
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুম কমিশন গঠন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি এবং অধ্যাদেশ ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই আলোচনাও চলছে।
এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মিরাজ শেখ নামে একজনকে গুম করার অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে এটিই গুমের প্রথম ঘটনা হতে পারে বলে ধারণা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
ঘটনাটি সামনে আসার পর বাংলাদেশে গুমের ঘটনা বা এ ধরনের তৎপরতা আবার শুরু হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
কী আছে নতুন বিলে
বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধে আইন প্রণয়নকে শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলটি সংসদে পাস হলে আইনে পরিণত হবে।
অনেকের ধারণা, সংসদে সরকারের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি আইন হিসেবে পাস করতে বড় কোনো বাধার মুখে পড়তে হবে না।
প্রস্তাবিত আইনে গুমকে অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বের করে এটিকে স্পষ্টভাবে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে অপরাধীর শাস্তি, ভুক্তভোগীর অধিকার ও ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিলে গুমের একটি সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারের অনুমোদনে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার করা বা গোপন রাখাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুমের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগী মারা গেলে অথবা পাঁচ বছর পরও তার সন্ধান না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিকল্পিতভাবে গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের বিধানও রাখা হয়েছে।
বিলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকার, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়াও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়েও বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।
কতটা কার্যকর হবে
অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যে ক্ষমতা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, নতুন বিলে সে ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ কারণেই আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো সংস্থার হাতে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রাখলে আইনটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রস্তাবিত বিল অনুযায়ী, অভিযোগ যদি কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেই বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না। সরকার অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলকে দায়িত্ব দিতে পারবে।
তবে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনী তদন্ত করলে সেটি কতটা স্বাধীন হবে, সে প্রশ্ন রয়েছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারও এমন তদন্তে আস্থা পাবে কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
মনজিল মোরসেদ বলেন, আইনের মধ্যে ফাঁকফোকর থাকলে সেই আইন কার্যকর হয় না।
তিনি বলেন, তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনীর হাতে না দিয়ে পৃথক কোনো কমিশন বা সিভিল প্রশাসনের মতো স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তার মতে, এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনীর তদন্তে খুব বেশি ভিন্ন ফল আসবে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধ তদন্তের জন্য একটি পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা প্রয়োজন। যার নিজস্ব জনবল ও বাজেট থাকবে এবং গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতা থাকবে।
তা না হলে তদন্তে পক্ষপাতের আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করেন তারা।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানও মনে করেন, গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকলে নতুন আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
তিনি বলেন, গুমের মতো ঘটনা তদন্তে বিশেষ কমিশন বা ইস্যুভিত্তিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা বাঞ্ছনীয়। নতুন আইনের মাধ্যমে গুমের ঘটনায় অভিযোগ করার একটি আইনি ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, যা ইতিবাচক।
আরও যেসব প্রশ্ন
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ তদন্তের বিষয়টি ছাড়াও আরও কিছু ত্রুটি দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।
তার মতে, আইনে গুমের শিকার ব্যক্তির অধিকার ও প্রয়োজনের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ভুক্তভোগীর পরিবারের ক্ষতিপূরণ কী হবে, সে বিষয়েও স্পষ্টতা নেই।
তিনি বলেন, একটি ঘটনায় আসামির সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের অনেক সুযোগ আইনের মধ্যেই রাখা হয়েছে। এর ফলে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ থেকে যেতে পারে।
মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, বাংলাদেশের আদালতে সাধারণ ফৌজদারি মামলাই বছরের পর বছর চলে। গুমের মতো জটিল মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা, প্রমাণ সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয় থাকে। সব মিলিয়ে ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করা বাস্তবে কঠিন হতে পারে।
সময়সীমা মানা না হলে কী হবে, সে বিষয়েও আইনে স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার কথা আইনে থাকলেও বাস্তবে তাদের সুরক্ষা দেবে কে, সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, অতীতে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন আইনের সফলতা শুধু কঠোর শাস্তির বিধান রাখার ওপর নির্ভর করবে না; বরং স্বাধীন তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই হবে এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের বড় প্রশ্ন। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এআরএম