Dhaka Mail Logo

জাতীয়

বিনোদনকেন্দ্র নেই, জলাশয়কেই ‘মিনি কক্সবাজার’ বানিয়েছে ঢাকার মানুষ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

ছুটির দিন মানেই ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী মুগদাসহ পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সামনে বিনোদনের জন্য তেমন কোনো বিকল্প নেই। তাই সামান্য সুযোগের সন্ধান মিললেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে ভিড় করেন তারা। 

এমন বাস্তবতায় ডেমরার ধার্মিকপাড়ার একটি জলাশয়কেন্দ্রিক বিনোদন স্পট ‘মিনি কক্সবাজার’ হয়ে উঠেছে আশপাশের মানুষের অন্যতম ভরসা।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। কেউ পরিবার নিয়ে নৌকায় চড়ার অপেক্ষায়, কেউ শিশুদের বিভিন্ন রাইডে আনন্দ দিচ্ছেন। জলাশয়ের দুই ঘাটেই নৌকা ও প্যাডেল বোটে চড়ার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের। পার্কের ভেতরে শিশুদের রাইড, আশপাশে স্ট্রিটফুড ও খেলনার দোকানেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।

2

যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে প্রায় ৪ কিলোমিটার গেলেই কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে মানিকদীর দিকে যাওয়া সড়ক ধরে উত্তরে প্রায় ২ কিলোমিটার এগোলেই ধার্মিকপাড়া। ওই এলাকায় সড়কের পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে ‘মিনি কক্সবাজার’। কোনাপাড়া-মানিকদী সড়ক ধরে মান্ডা-মুগদা পর্যন্ত যাওয়া যায়। তবে অপ্রশস্ত এই সড়কে মূলত অটোরিকশার চলাচল বেশি।

এখানে বিলের মতো একটি জলাশয় রয়েছে। সেই জলাশয়ে নৌকা ও প্যাডেল বোটে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ থাকায় এলাকাবাসীর কাছে জায়গাটি ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। জলাশয়ের পাশের বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে কয়েকটি ছোট পার্ক ও বিনোদনের ব্যবস্থা। শিশুদের জন্য রয়েছে চরকি, নৌকা দোলনা, জাম্পার, স্লিপার, ট্রেন ও ছোট নৌকা চালানোর মতো নানা রাইড।

নৌকা ও প্যাডেল বোটে চড়তে ৩০ মিনিটের জন্য গুনতে হয় ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে ১০ টাকা। দুটি ঘাট থেকে নৌকায় ওঠার ব্যবস্থা থাকলেও দর্শনার্থীর চাপের কারণে অনেককে অপেক্ষা করতে হয়।

মান্ডা এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন রাকিব হাসান। নৌকায় চড়ার অপেক্ষায় থাকা রাকিব বলেন, ‘পরিবার নিয়ে যাওয়ার মতো আশপাশে তেমন বিনোদনের কোনো জায়গা নেই। তাই এখানে আসলাম। অল্প একটু পথ, কিন্তু আসতে প্রায় বেশ সময় লেগেছে। ৩০ মিনিট নৌকা ভাড়া ৩০০ টাকা। ভাড়াটা অনেক বেশি, কিন্তু এটাও পাওয়া যাচ্ছে না, মানুষের এত ভিড়।’

বিনোদন স্পটটিতে শিশুদের বিভিন্ন রাইডের জন্যও আলাদা ফি দিতে হয়। সাম্পান নৌকার দোলনায় চড়তে লাগে ৬০ টাকা। স্লিপারে ১০০ টাকায় আনলিমিটেড খেলার সুযোগ রয়েছে। পার্কের মধ্যে ছোট একটি চৌবাচ্চায় ৫০ টাকার বিনিময়ে পাঁচ মিনিট নৌকা চালাতে পারে শিশুরা। পাশেই রয়েছে কোনাপাড়া শিশুপার্ক। সেখানেও একই ধরনের কয়েকটি রাইড রয়েছে।

পার্কের ভেতরে ও আশপাশে ফুচকা, চটপটি, আচারসহ বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিটফুডের দোকান বসেছে। শিশুদের খেলনা ও ফুলের দোকানেও ভিড় দেখা গেছে।

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সেখানে ঘুরতে এসেছেন মাহফুজ। তিনি একটি ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে কাজ করেন। তার ভাষ্য, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার মতো বিনোদনকেন্দ্রের তীব্র সংকট রয়েছে।

3

মাহফুজ বলেন, ‘সুস্থ বিনোদনের কোনো মাধ্যম এই শহরে নেই বললেই চলে। ডেমরা-যাত্রাবাড়ী তো একেবারেই অবহেলিত। ছুটির দিনে কোথায় যাব? এটা কাছে হওয়ায় আসলাম। এত মানুষ এখানে বিনোদনের জন্য আসে, কিন্তু চলাচলের রাস্তাটিতে কোনো শৃঙ্খলা নেই। বলতে গেলে কোনাপাড়া থেকে স্পট পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই জ্যাম। প্রশাসনের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাইডগুলোতে ইচ্ছেমতো ফি নেওয়া হয়। এরপরও মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। মানুষ কী করবে, বিকল্প তো কিছু নেই।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন সরকারি ছুটি ও বিশেষ দিনে ‘মিনি কক্সবাজারে’ দর্শনার্থীর চাপ আরও বেড়ে যায়। এতে কোনাপাড়া থেকে বিনোদন স্পট পর্যন্ত অপ্রশস্ত সড়কে অটোরিকশার বিশৃঙ্খল চলাচলে তীব্র যানজট তৈরি হয়। বুধবার বিকেল ও সন্ধ্যায়ও যানজটের কারণে অনেক দর্শনার্থীকে হেঁটে স্পটে যেতে এবং সেখান থেকে ফিরতে দেখা গেছে।

রাজধানীর একাংশে পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্রের অভাবের এই চিত্রই যেন ‘মিনি কক্সবাজারের’ ভিড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নৌকাভাড়া ও রাইডের তুলনামূলক বেশি খরচ, দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা যানজট—কোনোটিই মানুষকে ফেরাতে পারছে না। কারণ, আশপাশে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর বিকল্প যে খুবই সীমিত।

টিএই/এএইচ