Dhaka Mail Logo

জাতীয়

বায়ু, শব্দ, দৃষ্টি ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে বাপার ১০ দফা সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

বায়ু, শব্দ, দৃষ্টি, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে ১০ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সংগঠনটি বলেছে, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাপার আয়োজনে বায়ু-শব্দ-দৃষ্টি-পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ: প্রতিকার কতদূর? শীর্ষক সেমিনারে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাত ১২টার পর দেশের সব বিলবোর্ডের আলো বন্ধ করা হলে দৃষ্টিদূষণ কমার পাশাপাশি বিদ্যুতের অপচয়ও কমবে। বর্ষার পর কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা হবে এবং এসব ইটভাটার অনুমোদন দেওয়া কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে। পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারের পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর কথা জানান তিনি।

বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশসম্মত বিকল্প পণ্যের উদ্ভাবন, বাজারজাত ও সহজলভ্য করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ঢাকায় উৎপাদিত হয় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টন। শহরাঞ্চলে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে বেড়ে প্রায় ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় এ হার ২২ দশমিক ২৫ কেজি। দেশে বছরে প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। মোট বর্জ্যের ৫৫ শতাংশই অপরিকল্পিতভাবে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয়।

তিনি বলেন, পলিথিন ও প্লাস্টিকের কারণে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদী-জলাশয়, ভূগর্ভস্থ পানি ও বাস্তুতন্ত্রের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে। প্লাস্টিক ও পলিথিন রোধে ৩আর আইন দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ বাংলাদেশের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় বাধা। এর কারণে দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর কমছে। নির্মাণকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা, যানবাহন, গৃহস্থালি চুলার ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানো বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস।

শব্দদূষণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঢাকার ৮২ শতাংশ স্থানে শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের বেশি। ফার্মগেট, শাহবাগ ও গাবতলীর মতো এলাকায় তা ৮০ থেকে ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছায়। অপরিকল্পিত নগরচিত্রের কারণে দৃশ্যদূষণও বাড়ছে। ইএসডিওর গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বিলবোর্ডের সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৫১ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৯৯৭টিতে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, বায়ুর মাধ্যমে মানুষ বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর কণা গ্রহণ করছে। এতে দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তিনি দূষণকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নীতি বাস্তবায়ন এবং আন্তদেশীয় দূষণ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের দাবি জানান।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, দূষণকারীদের শাস্তির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনে প্রণোদনা দিতে হবে। পলিথিনের বিকল্প উদ্ভাবনে তরুণদের উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি।

image

বাপার নির্বাহী সদস্য আহসান রনি বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণে অবদান রাখা বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। প্রতিদিন আড়াই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ ফেলে দেওয়া হয়। এসব বর্জ্য নালা-নর্দমায় পড়ে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।

বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ২০০০ সালে নিষিদ্ধ করা পণ্য কয়েক বছরের মধ্যে কীভাবে আবার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর দায় শুধু জনগণের নয়, সরকার ও ব্যবসায়ীদেরও নিতে হবে।

সেমিনারে বায়ু, শব্দ, দৃষ্টি ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, শিক্ষাক্রমে বায়ুমান ও বায়ুদূষণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, সরকারি কাজে ব্লক ইট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, শিল্পকারখানায় অনলাইন বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং শব্দদূষণ বিধিমালা ২০২৫ কঠোরভাবে প্রয়োগ।

এ ছাড়া যানবাহনের নিয়মিত শব্দ পরীক্ষা, রাত ১০টার পর এলইডি আলো নিয়ন্ত্রণ, ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার গুছিয়ে রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৯৯৯ ও হটলাইন সম্পর্কে প্রচার বাড়ানো এবং সংকেতব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করার সুপারিশ করা হয়।

সেমিনারে বাপার কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এএইচ/এআর