নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অগ্রগতি ও অবনতির মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পর্যালোচনায়। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, অর্থনীতির ৩১টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মধ্যে ১২টিতে অগ্রগতি হলেও ১৯টি সূচকে অবনতি ও গভীর শঙ্কা রয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে সিপিডি আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
রিফর্ম ট্র্যাকারের আওতায় সরকারের নেওয়া ৩৬২টি পদক্ষেপের খাতভিত্তিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়, কর্মসংস্থান ও ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চাপ রয়েছে।
যে ১২ সূচকে অগ্রগতি
সিপিডির পর্যালোচনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এমন সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি, কৃষিঋণ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন, এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানি, সামাজিক সুরক্ষা, ডিজিটাল লেনদেন, ব্যাংক খাতে তদারকি, আমানত বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ।
ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনা ও তদারকি বাড়ানোর ফলে প্রবাসী আয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপও কমেছে।
তৈরি পোশাকসহ প্রধান রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি ফিরতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে কৃষিঋণ বিতরণ, এডিপি বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি।
১৯ সূচকে গভীর শঙ্কা
অন্যদিকে ১৯টি সূচকে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি। নিত্যপণ্যের উচ্চ দামে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি কম বাড়ায় চাকরিজীবী ও শ্রমিকদের প্রকৃত আয়ও কমেছে।
সিপিডির হিসাবে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও ঋণ পরিশোধের চাপের কারণে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৫৫ হাজার ১২৯ দশমিক ৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ কমে যাওয়াকেও বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। উচ্চ সুদের হার ও ব্যবসায়ীদের আস্থার সংকটে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়াও শিল্পায়নের গতি কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এছাড়া রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, তরুণদের বেকারত্ব, শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট, বিদেশি বিনিয়োগে ধীরগতি, বাণিজ্যিক ভারসাম্যে চাপ এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকটকে ঝুঁকিপূর্ণ সূচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি
সিপিডি বলছে, নতুন সরকারের নেওয়া নীতিগত উদ্যোগগুলোর পূর্ণ প্রভাব দৃশ্যমান হতে আরও সময় লাগতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে শুধু প্রবাসী আয় ও রিজার্ভের উন্নতি দিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানো সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন: উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়াতে ঢাকায় এফএইচের সভা
মাথাপিছু ঋণ বাড়ার পেছনে তিনটি কারণও চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ কমে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পুরোনো উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি বৃদ্ধি।
সিপিডির হিসাবে, বৈদেশিক সহায়তার নিট প্রবাহ ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২২ দশমিক ৩ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ দশমিক ২ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে টাকার হিসাবে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে।
এমআর