Dhaka Mail Logo

জাতীয়

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জনগণকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে: আইনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সবার আগে বাংলাদেশের জনগণকে দল-মত নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয়; এটি মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য জাতীয় ঐকমত্য ও শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে হবে।

রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল ১১টায় ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নীতি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, আমাদের আমেরিকাকে এটা বুঝাতে হবে, চীনকে এটা বুঝাতে হবে, ইন্ডিয়াকে এটা বুঝাতে হবে এটা অবশ্যই ঠিক। তবে সবার আগে যাদের বুঝাতে হবে, সেটা হলো বাংলাদেশের জনগণকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দল-মত নির্বিশেষে সব মতভেদ ভুলে বাংলাদেশের জনগণকে উপলব্ধি করতে হবে যে, দেশের ভূখণ্ড, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সবার আগে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো বিষয়ে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হলে দেশের মানুষের ঐক্য ও সমর্থনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এই দেশের প্রতিটি মানুষের দেশের প্রতি কর্তব্যবোধ রয়েছে। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নাগরিকের দায়িত্বের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের আচরণের বিষয়ে সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও নীতিগত নির্দেশনা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, একদিকে এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট, অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। রোহিঙ্গারা যখন নিজ দেশে গণহত্যার শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন বাংলাদেশের জনগণ মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে তাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। একজন মানুষ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সহজাত ও সার্বজনীন অধিকার লাভ করে। জীবন ধারণ, খাদ্যসহ ন্যূনতম অধিকারগুলো মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। নিজ দেশে এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে এসেছে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকে ন্যাশনাল ইউনিটির জায়গায় নিতে পারলে, তা অন্যতম একটা ফলপ্রসূ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এ বিষয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কূটনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা সবচেয়ে বড় বিষয়। তবে নিরাপত্তার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা ও অন্যান্য নিরাপত্তাজনিত বিষয়ও সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

আইনমন্ত্রী সামাজিক চাপগোষ্ঠী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগের পক্ষে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আপনারা আপনাদের ভাবনাটা আমাদের দেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে কমিটি আছে, সেখানে দেন। আপনাদের ভাবনাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কমিটি বিবেচনা করবেন— আমি বিশ্বাস রাখি।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে যেতে সামাজিক চাপগোষ্ঠীগুলোর সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কীভাবে সংকটকে স্থায়ী সমাধানের দিকে নেওয়া যায়; সেই বিষয়ে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের গঠনমূলক মতামত প্রয়োজন।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করতে চায় না উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়। বরং রোহিঙ্গাদের পরিচয়, অধিকার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার আইনের আলোকে দেখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি না। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী না। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা মানুষ। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার আছে।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠী এবং তাদের মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করা উচিত।

আইনমন্ত্রী নীতি গবেষণা কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সামাজিক প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার আইনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে জনমত গড়ে তুলতে হবে। সরকারের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উদ্যোগের পেছনে দেশের আপামর জনগণের সমর্থন রয়েছে— এমন একটি শক্তিশালী জনমত তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আপনারা বাংলাদেশের মানুষকে, বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করান। পাবলিক অপিনিয়ন তৈরি করেন— রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ সরকার যে পদক্ষেপ নিতে চায়, সেই পদক্ষেপের পেছনে বাংলাদেশের আপামর জনতার সমর্থন আছে।

আইনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এভাবে জাতীয় ঐকমত্য ও জনমত তৈরি করা গেলে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ আরও সুগম হবে। এক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মোকাবিলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই ধারাকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক সভাপতিত্ব করেন। সূচনা বক্তব্য দেন নীতি গবেষণা কেন্দ্রের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. শফিক আহমেদ।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান। তিনি রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট, মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের জন্য উদ্ভূত মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।

আলোচনায় অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা, দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক পারভেজ পালমা, রোহিঙ্গা নারী অধিকারকর্মী রোশিয়া সুলতানা এবং একজন রোহিঙ্গা প্রতিনিধি।

আলোচনা শেষে উপস্থিত অতিথি, আলোচক ও অংশগ্রহণকারীদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা, বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ এবং সংকটের টেকসই সমাধানের সম্ভাব্য পথ নিয়ে মতবিনিময় হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মোহাম্মদ ইসা ইবনে বেলাল ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সভায় বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী ও রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজনের বিভিন্ন তথ্য নীতি গবেষণা কেন্দ্র প্রকাশ করেছে।


এম/এফএ