Dhaka Mail Logo

জাতীয়

তিন চাকার অটোরিকশায় মানবতার গল্প

মাহফুজ উল্লাহ হিমু

২২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাজারো সিএনজি অটোরিকশা ছুটে চলে। সিএনজিতে উঠলে সাধারণত চোখে পড়ে চালকের আসন, মিটারের হিসাব আর গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া। যাত্রী ওঠেন, গন্তব্যে পৌঁছেন ভাড়া দেন-গল্পটা সাধারণত এতটুকুই। তবে এর ব্যতিক্রম ওবায়দুর রহমান শেখের অটোরিকশা। এতে উঠলে মনে হবে, এটি শুধু যাতায়াতের বাহন নয়; যেন যাত্রীদের জন্য ছোট্ট একটি সেবাকেন্দ্র।

যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে নিজের সিএনজি অটোরিকশায় নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী রেখেছেন ওবায়দুর শেখ। রয়েছে বিশুদ্ধ পানি, টিস্যু, মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা ও প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ। ধর্মীয় প্রয়োজনের জন্য আছে তসবিহ, টুপি, মেসওয়াক, কায়দা-আমপারা ও নামাজ শিক্ষার বই।

শুধু প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখাই নয়, যাত্রীদের অভ্যাসের বিষয়টিও মাথায় রেখেছেন তিনি। অনেকে অটোরিকশার ভেতরে সিগারেট ধরান। ধূমপানে নিরুৎসাহিত করতে এমন যাত্রীদের জন্য গাড়িতে রেখেছেন সেন্টার ফ্রেশ, চকলেট, আচার। এসব সামগ্রী যাত্রীরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন।

Dhaka_cng_4যাত্রীদের সচেতন করতে গাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট কাগজে লেখা রয়েছে নানা বার্তা। কোথাও লেখা ‘ধূমপানমুক্ত বাহন’। আবার কোথাও ‘আপনার পেছনে টিস্যু আছে, ব্যবহার করতে পারবেন’, আবার কোথাও লেখা, ‘এখানে মোবাইল চার্জ করতে পারবেন’। আর এক জায়গায় স্পষ্ট করে লেখা, ‘বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সবার জন্য উন্মুক্ত।’ এসব লেখা আলাদা করে নজর কাড়ে যাত্রীদের।

গাড়ির এক পাশে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগে লেখা ‘প্রাথমিক সেবামূলক ব্যবস্থা’। এর ভেতরে রয়েছে সিভিট, স্যালাইন, নাপা, বমি ও মাথাব্যথার ওষুধ, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধসহ আরও কিছু সাধারণ ওষুধ। সামান্য অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা যেন তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা পান, সে লক্ষ্যেই এসব রাখা হয়েছে বলে জানান ওবায়দুর শেখ।

নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে অটোরিকশার এই চালক বলেন, আমার সার্টিফিকেটের নাম ওবায়দুর রহমান শেখ। তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেখানে সবাই আমাকে ওবায়দুল্লাহ নামে ডাকেন।

এমন উদ্যোগের পেছনের গল্প তুলে ধরো তিনি জানান, ২০২০ সালে করোনার সময় বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি ও বিধিনিষেধ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। মসজিদে নামাজ আদায়, জামাতে দাঁড়ানোসহ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর যাত্রীদের সঙ্গে করোনার স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কথা বলতে বলতে গাড়িতে বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি শুরু করেন।

Dhaka_cng-2

প্রথম দিকে তার উদ্যোগ সীমাবদ্ধ ছিল ধূমপানবিরোধী বার্তায়। গাড়িতে লিখে দেন, ‘ধূমপান করা যাবে না’, ‘ধূমপানমুক্ত বাহন’। পরে করোনার সময়ের পরিস্থিতি বদলে গেলে ইসলামী বিভিন্ন বিষয়ও গাড়িতে যুক্ত করতে থাকেন। গাড়ির দোয়া, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-সহ বিভিন্ন লেখা টাঙানোর পাশাপাশি তসবিহ, টুপি, মেসওয়াক, কায়দা, আমপারা ও নামাজ শিক্ষার বই রাখেন।

ওবায়দুর শেখ বলেন, ‘মানুষ যখন গাড়িতে উঠে সিগারেট খায়, মোবাইল দেখে, তখন এই সময়টা এভাবে ব্যয় না করে যাতে মানুষ আমলের মধ্যে কাটাতে পারে, সেই চিন্তা থেকেই এগুলো রাখা।’

শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, যাত্রীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথাও মাথায় নিয়ে সেখানে রেখেছেন বিশুদ্ধ খাবার পানি। যাদের ওয়াসার খোলা সাধারণ পানি পছন্দ নয়, তাদের জন্য ইনটেক পানির ব্যবস্থাও আছে।

যাত্রীদের প্রশংসা

গাড়িতে ওঠা যাত্রীদের প্রতিক্রিয়াও তাকে উৎসাহিত করে বলে জানান ওবায়দুর। তার ভাষ্য, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই অধিকাংশ যাত্রী তার উদ্যোগকে দেখেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান—সব ধর্মের মানুষই তার গাড়িতে ওঠেন। অধিকাংশই উদ্যোগটির প্রশংসা করেন এবং তাকে দোয়া করেন।

Dhaka_cngকারও কারও কাছে তার গাড়িটি হয়ে ওঠে শেখার জায়গাও। যাত্রীরা তাকে বলেন, তার গাড়িতে উঠলে অন্যরকম একটি শিক্ষামূলক পরিবেশ পাওয়া যায়।

‘মানবসেবাই’ মূল কথা

ওবায়দুর রহমানের কাছে অবশ্য এসব আয়োজনের মূল কথা একটাই, ‘মানবসেবা’।

তিনি বলেন, ‘আমি মানুষটা ছোট হলেও, কাজটা ছোট হলেও মানবসেবা করতে আমার কাছে খুব ভালো লাগে। আমি যখন একটা মানুষকে উপকার করতে পারি, তখন আমার আত্মার মধ্যে তৃপ্তি পাই। আমি আনন্দ পাই, শান্তি পাই।’

এই সেবার খরচও নিজের আয় থেকেই বহন করেন অটোরিকশার এই চালক। প্রতিদিনের আয় থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা এ কাজে রাখেন। তার ভাষ্য, দিনে ৭০০, ১ হাজার কিংবা ১২০০ টাকা আয় হলে সেখান থেকে কখনো ১৫০ টাকা পর্যন্ত এসব কাজে ব্যয় করেন।

২০০১ সাল থেকে অটোরিকশা চালানো ওবায়দুরের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর। থাকেন মিরপুর-১২ এলাকায়। তার দুই মেয়ে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে বর্তমানে মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন। ১৩ বছর বয়সী ছেলেও হাফেজি পড়াশোনা শেষ করেছে।

পড়াশোনা থেমে গেলেও থামেনি মানবসেবার পথচলা

ওবায়দুরের পড়াশোনার পথটাও খুব বেশি দূর এগোয়নি। এসএসসি পরীক্ষার আগে লেখাপড়ায় ছেদ পড়ার পর আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। পরে দাখিল শেষ করে আবার সাধারণ শিক্ষায় ফিরে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ঢাকায় চলে আসায় আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। ১৯৯৯ সালে বিয়ে করেন এবং পরে কাজের সঙ্গে যুক্ত হন।

Dhaka_cng_3সেই থেকে সিএনজি অটোরিকশা চালিয়েই সংসার চালাচ্ছেন তিনি। তবে নিজের পেশার পাশাপাশি মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাটা ধরে রেখেছেন। সেই ইচ্ছা থেকেই ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছেন তার গাড়িটিকে।

ওবায়দুরের কাছে তার গাড়িটি কেবল যাত্রী বহনের বাহন নয়। সীমিত জায়গার মধ্যেই যতটুকু সম্ভব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি ছোট্ট চেষ্টা এটি। আর সেই চেষ্টাতেই সাধারণ একটি সিএনজি অটোরিকশা হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য ‘সেবাখানা’।

এমএইচ/এমআর