মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৯ এএম
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। রাজধানী থেকে সাভারের জনবহুল এলাকা, সড়কের পাশ, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ কিংবা পরিত্যক্ত স্থাপনা থেকে মিলছে সন্দেহজনক এসব বস্তু। কোথাও প্রেসার কুকারে উদ্ধার হচ্ছে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম, আবার কোথাও বোমাসদৃশ বস্তু শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরকহীন বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে-হঠাৎ কেন এমন বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। এসব বিস্ফোরক কোথা থেকে আসছে এবং এর নেপথ্যে কারা?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এগুলো মজুত বা ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত-তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, জনবহুল এলাকা, সড়কের পাশে কিংবা পরিত্যক্ত স্থাপনা থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা গিয়ে এলাকাটি নিরাপদ করে বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করেন।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা
বোমা উদ্ধারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রথমটি ঘটে ২৪ জুলাই। ওই দিন বিকেলে রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর রাখা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিট গিয়ে সেটি নিষ্ক্রিয় করে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রথযাত্রার দিনে ঘটনাটি ঘটে। এর আগে রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ছয় দিন পর ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদির দোকান থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ব্যাগে করে কে বা কারা সেটি সেখানে রেখে যায়। তবে এ ঘটনায় জড়িতদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
১ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ দুটি বস্তু উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। পরে সিটিটিসি জানায়, সন্দেহজনক ব্যাগ দুটিতে কোনো বিস্ফোরক ছিল না। একটি ব্যাগে জর্দার কৌটা ও পান পাওয়া যায়।
১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় সিটিটিসি। সংস্থাটির দাবি, ওই বাড়ি থেকে প্রেসার কুকার বা ‘কেটলি বোমা’, বিপুল গানপাউডার এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
সবশেষ ১৭ আগস্ট রাজধানীর ডেমরায় একটি বাসা থেকে দুটি পাইপ বোমা উদ্ধার করে পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) সদস্যরা। এ সময় জুয়েল ওরফে জুয়েল ওস্তাদ ওরফে জুয়েল ভূঁইয়া এবং আরিফ চৌধুরী নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে সিটিটিসির সদস্যরা বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করেন।
সিটিটিসি দাবি করে, গ্রেফতার জুয়েল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুনের সহযোগী।
ঢাকা ও সাভার ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অনেক স্থানে বোমা ও ককটেল উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়।
একের পর এক বোমা বা বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন কারণে বিস্ফোরক রাখার ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই ব্যক্তি বা চক্র আছে কিনা-এমন কোনো তথ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি। উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের ধরন, উপকরণ সংগ্রহের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সিটিটিসির প্রধান শামসুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা এসব ঘটনায় তদন্ত করছি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা কঠিন এসব কারা ঘটিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগকে আমার বক্তব্য দেওয়া আছে, তাদের বলা হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের এডিসি নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘সব ঘটনায় পুলিশ বোমা উদ্ধার করে জনগণের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছে।’
নেপথ্যে কারা, খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা
জুলাই ও আগস্টে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পেছনে কারা রয়েছে, তা জানতে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক ইউনিট কাজ করছে। উদ্ধার হওয়া প্রেসার কুকার বোমা ও অন্যান্য বিস্ফোরকও পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জানিয়েছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে কারও কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত, অপরাধী চক্র কিংবা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত এসব ঘটনার সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো জঙ্গি সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র উঠেপড়ে লেগেছে। তারাই এমনটা করতে পারে।
গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছর ধরেই পলাতক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশকে অস্থিতিশীল করার নানা ষড়যন্ত্র করেও ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র প্রমাণে নতুন করে মিশনে নেমেছে কিনা তা তদন্ত করে দেখছেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এজন্য প্রতিটি এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম তালিকা ও ঠিকানা সংগ্রহ করছেন।
পুরোনো ঘটনাগুলোও নজরে
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পাশাপাশি দেশের অতীতের বোমা ও জঙ্গি তৎপরতার ঘটনাগুলোও পর্যালোচনা করছেন গোয়েন্দারা।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ওই সময় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। পরে স্তিমিত হয়ে পড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনটির কার্যক্রম।

এরপরও বিভিন্ন সময়ে দেশে বিচ্ছিন্ন জঙ্গি তৎপরতার ঘটনা ঘটলেও সরকারের হস্তক্ষেপে পরে তা কমে আসে। সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের সঙ্গে অতীতের জঙ্গি তৎপরতার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২৪ ঘণ্টা সক্রিয় বিশেষায়িত ইউনিট
মতিঝিলের ঘটনার পর থেকে সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে। কোথাও বোমা বা বোমাসদৃশ কোনো বস্তু পড়ে থাকার খবর পেলেই দ্রুত ঘটনাস্থলে যাচ্ছে বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত দল। কোনো কোনো সংস্থায় সদস্যদের ছুটি সীমিত বা বাতিল করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ বিস্ফোরক মজুত শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্যও বড় ঝুঁকি। তাই বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে উৎস শনাক্ত করা এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
সামাজিক মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছে মনিটরিং
গত মাস থেকে সামাজিক মাধ্যমে মনিটরিং বাড়িয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পুরোনো জঙ্গি মামলায় জড়িতরা সামাজিক মাধ্যমে তাদের সংগঠনের নামে পেজ বা কোন গ্রুপ খুলে কার্যক্রম চালাচ্ছে কিনা তা, তারা মনিটরিং করছেন তারা। নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরির ও জেএমবির কার্যক্রম অনলাইনে চলছে কিনা তাও খতিয়ে দেখছে সাইবার বিভাগগুলো। কোন পোস্টে সন্দেহ হলে তার এডমিন থেকে শুরু করে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যা বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘যে প্রেক্ষাপটেই এসব ঘটনা ঘটানো হোক না কেন, এর মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা থাকতে পারে। এর পেছনে নানা শঙ্কা ও কারণও রয়েছে। তবে সেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বহুধারায় বিভক্ত। এছাড়াও আমাদের এখানে কখনো প্রকাশ্য কখনো অপ্রকাশ্য জঙ্গিবাদের চর্চা বা বা তাদের কর্মকাণ্ড সক্রিয় আছে। তারা নতুন করে তাদের অবস্থান জানান দিতে কিংবা একটি রাজনৈতিক দল যারা ক্ষমতার বাইরে আছেন, তারা ক্ষমতায় ফিরতে চান। ফলে তারা ক্ষমতায় ফেরতে এসব ঘটনা ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
এছাড়া এসব ঘটনার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবেশ বা শঙ্কা তৈরি করা হচ্ছে কিনা সেটা ভেবে দেখার বিষয় বলে মনে করেন ঢাবির এই শিক্ষক। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি চক্র ও এসব ঘটনায় মূলহোতা কারা তাদের চিহ্নিত করে আইনের আনা প্রয়োজন। তা করতে পারলে এমন কর্মকাণ্ড কমে আসবে ও মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তা শঙ্কা আছে তাও কমবে।
এমআইকে/এমআর