ঢাকা মেইল ডেস্ক
২১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র দিলকুশায় উঁচু প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত প্রাঙ্গণের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গভবন। এটি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়। কিন্তু এই স্থাপনার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের চেয়েও বহু পুরোনো। কয়েক শতাব্দী আগে যেখানে ছিল একটি সুফি মাজার, সময়ের পরিক্রমায় সেই স্থানই রূপ নিয়েছে বাগানবাড়ি, গভর্নর হাউজ এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের বঙ্গভবনে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গভবনের সূচনা খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় পঞ্চদশ শতকের সুলতানি আমলে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সুলতান ইউসুফ শাহের শাসনামলে সুফিসাধক শাহ জালাল দাখিনী গুজরাত থেকে পূর্ববঙ্গে এসে বর্তমান মতিঝিল এলাকায় একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৪৭৬ সালে তিনি নিহত হন এবং বর্তমান বঙ্গভবন চত্বরে তাকে সমাহিত করা হয়। তার পাশেই কবর দেওয়া হয় তার অনুসারী শাহ কামালকে। ধীরে ধীরে এই সমাধিকে কেন্দ্র করেই এলাকাটি মাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেই গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধ আজও বঙ্গভবনের ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে।
মুঘল আমলে এলাকাটি নতুন পরিচয় পায়। সুবাহদার মীর জুমলার আমলে নওয়ারা মহলের দায়িত্বে থাকা মির্জা মুকিমের বাসভবন ছিল বর্তমান বঙ্গভবন এলাকায়। সে সময় নদীপথ রক্ষা ও নৌবহর পরিচালনার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে এলাকাটির গুরুত্ব বাড়ে। প্রচলিত রয়েছে, মির্জা মুকিমের মেয়ের অলংকার ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান ‘মতিঝিল’ নামের উৎপত্তি।
ব্রিটিশ শাসনামলে জায়গাটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়। আর্মেনীয় জমিদার মানুকের মালিকানাধীন ‘মানুক হাউজ’ পরে কিনে নেন ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি। তিনি সেখানে গড়ে তোলেন মনোরম একটি বাগানবাড়ি, যার নাম দেন ‘দিলকুশা বাগ’। বিশাল এই বাগানে ছিল লেক, ফোয়ারা, মাছের চৌবাচ্চা এবং দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির বৃক্ষ।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হলে ঢাকাকে রাজধানী করা হয়। তখন প্রশাসনিক প্রয়োজনেই দিলকুশা এলাকার দক্ষিণাংশে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য নির্মাণ করা হয় ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’। ১৯০৬ সালে এর উদ্বোধন হলেও নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১১ সালে। ওই সময় ভাইসরয় এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নর ঢাকা সফরে এ ভবন ব্যবহার করতেন। প্রশাসনিক ভবন হিসেবে বর্তমান বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা মূলত তখন থেকেই শুরু।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হলে ভবনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গভর্নর হাউজ’। ব্রিটিশ আমলের কাঠের তৈরি ভবনটি ১৯৬১ সালের এক ঘূর্ণিঝড়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে তৎকালীন গভর্নর আজম খানের উদ্যোগে ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর আদলে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়, যার কাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে। বর্তমান বঙ্গভবনের মূল স্থাপত্য সেই সময়েরই নির্মাণ।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতির শপথ ঘিরে যত আয়োজন
মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি গভর্নর হাউজে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলাকালে ভারতীয় বিমানবাহিনী সেখানে হামলা চালায়। বিমান হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর কিছুক্ষণ পরই তৎকালীন গভর্নর এ এম মালিক ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করেন। স্বাধীনতার পর ভবনটি সংস্কার করা হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর তৎকালীন গভর্নর হাউজে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকে ভবনটির নতুন নাম রাখা হয় ‘বঙ্গভবন’। একই সঙ্গে এটিকে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এরপর ১৯৭২ সালে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির শপথ, সরকার গঠন, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অনুষ্ঠানসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে বঙ্গভবন।

কয়েক শতাব্দী আগে যে স্থানটি ছিল একটি সুফি মাজার, ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে সেটিই আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম প্রতীক। মাজার, বাগানবাড়ি, গভর্নর হাউজ থেকে বঙ্গভবন হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রা দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এমআই