Dhaka Mail Logo

জাতীয়

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:১১ পিএম

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে আয়োজন করা হয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন করা হবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদকক্ষে চলবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া। এতে মোট ভোটার থাকবেন ৩৪৯ জন।

এর আগে এমন নির্বাচন সবশেষ ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার পর আয়োজন করা হয়েছিল। এরপর আরও আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নে একক প্রার্থী থাকায় সেগুলোতে ভোটের আয়োজন করা হয়নি।

এবার রাষ্ট্রপতি পদের জন্যে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন দুইজন প্রার্থী। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দলটির সাবেক মহাসচিব এবং সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপি’র চেয়ারম্যান অলি আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী, যদিও জোট থেকে প্রথমে রাষ্ট্রপতি পদে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা অলি আহমদ একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি আলাদা দল করেন এবং সবশেষ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যুক্ত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা।

প্রসঙ্গত, আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা না হওয়ায় মোট সংখ্যার চেয়ে একজন ভোটার কম আছেন।

তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য তার দলের বিপরীতে গিয়ে কাউকে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।

ফলে ২০৯ জন সংসদ সদস্য নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন, তা প্রায় নিশ্চিত।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংসদের চিফ হুইপ।

PE
Cস্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৮ জন ব্যক্তি ২২ মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন

নির্বাচন প্রক্রিয়া

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব অর্থাৎ ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

তবে সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকায় এই নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে বৈঠকের সভাপতিত্ব করার পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করবেন।

অন্যান্য নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হবে না এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর পাশে নিজের সম্পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন সংসদ সদস্যরা। তারা নিজ আসনে বসেই ভোট দেবেন।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একইসঙ্গে সংসদ সদস্য হওয়ায় তিনি নিজেও এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন। তবে সংসদ সদস্য না হওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী অলি আহমদ ভোট দিতে পারবেন না।

বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, ভোট গ্রহণ শুরু হবার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভোট দেওয়ার সময়টি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

বাকি সংসদ সদস্যদের ভোট প্রদানের সময় তা বন্ধ থাকবে।

পরে ভোট গণনার সময়টি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এবং সংসদ কক্ষেই ফল ঘোষণা করা হবে। পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

PE1
১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবরে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ পত্রিকা

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির করণীয় এবং বর্জনীয়

বর্তমানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদকে অনেকটা 'আলংকারিক' হিসেবে বর্ণনা করা হলেও একসময় এই পদাধিকারীরাই ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেই, আবার অনেক ক্ষমতা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হিসেবে আপদকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতিই হয়ে উঠতে পারেন ক্ষমতার মূল উৎস।

১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর পর থেকেই বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে এবং রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের প্রধান।

PE2
বঙ্গভবন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাসভবন

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ— এই দুটি কাজ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারেন।

বাকি সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই কাজ করতে হয়, যা সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ সংসদ আহ্বান করা, স্থগিত করা ও ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেওয়া, জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তি চুক্তি অনুমোদন, ক্ষমা প্রদর্শনসহ সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই কাজ করবেন রাষ্ট্রপতি।

যদিও প্রধানমন্ত্রী আসলেই রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়েছেন কিনা, তা নিয়ে কোনো আদালত প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলেও সংবিধানে উল্লেখ আছে।

অর্থাৎ দুটি ক্ষেত্র ছাড়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ীই তাকে কাজ করতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেও মূলত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান বা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমার মধ্যেই আবদ্ধ। কিন্তু রাষ্ট্রের বিশেষ পরিস্থিতিতে এই পদের ক্ষমতা ভিন্ন হয়ে উঠতে পারে। যার উদাহরণ বেশ কয়েকবারই বাংলাদেশে দেখা গেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রপতিকে একক বা স্বাধীনভাবে ক্ষমতার প্রয়োগও করতে দেখা গেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এফএ