নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩০ এএম
শুধু নারীদের যাতায়াতের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৪টি বাস চালু করেছে বাংলাদেশের সরকার। সম্পূর্ণ নারী চালক ও কন্ডাক্টরদের পরিচালিত এই বাসগুলোর রং যেমন গোলাপি, তেমনি কর্মচারীদের পোশাকও একই রঙের। ফলে অনেকে ‘পিংক বাস’ও বলছেন এগুলোকে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) এই বাসগুলোর যাত্রা শুরু হয়। তবে বাস চালুর ঘোষণা আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই উদ্যোগকে অনেকে যেমন স্বাগত জানিয়েছেন, তেমনি অনেকে সমালোচনাও করছেন।
নারীর নিরাপত্তায় পৃথক বাস দিয়ে ‘বিচ্ছিন্নকরণের মাধ্যমে সত্যিই কি নারী নিরাপদ হন?’ এমন প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
বুধবার সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায় একটি ফ্লাইওভারে ওঠার সময় বিপাকে পড়েন একজন নারী বাসচালক। পরবর্তীতে একজন পুরুষ চালকের সহযোগিতায় বাসটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিষয়টি উল্লেখ করেও নারীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পোস্ট করতে দেখা গেছে কাউকে কাউকে। আবার, অনেকে এমন প্রশ্নও তুলেছেন, পাবলিক বাসে নারীর নিরাপত্তার মূল প্রশ্নের সমাধান না করে এমন পদক্ষেপ নেওয়া বরং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকেই তুলে ধরেছে।
_20260820_033141593.jpg)
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরদার আমিরুল ইসলাম নামে একজন ব্যক্তি লিখেছেন, ‘এই বাস নারীর ক্ষমতায়নকে আরেক ধাপ খর্ব করবে। নারীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিসর আরেকটু সংকুচিত করবে।’
তবে, এমন উদ্যোগে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা হলে নারী অধিকারকর্মীদের কয়েকজন বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থায় সরকারের নেওয়া এমন উদ্যোগ ইতিবাচক এবং বাসের সংখ্যা এই মুহূর্তে আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
নারীর জন্য বাস নিয়ে বিতর্ক
মঙ্গলবার এই বাস উদ্বোধনের প্রথম দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যাতে দেখা যায়, একজন নারী একটি পাবলিক বাসে উঠতে গেলে তার আগে ওই বাসে ওঠা এক পুরুষ দরজায় হাত দিয়ে রেখেছেন। এই ভিডিওটিরই স্ক্রিনশট নিয়ে পাবলিক বাসে নারীকে যাতায়াত করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অনেকেই ফেসবুকে সমালোচনা করেছেন।
মারওয়া জান্নাত মাইশা নামে একজন নিরাপদে চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা কোনো বিশেষ দয়া কিংবা করূণার গোলাপি খাঁচা চাই না। আমরা সমাজ, বাজার কিংবা গণপরিবহন কোথাওই এই আইসোলেশন চাই না। একটা কমন প্ল্যাটফর্মে পুরুষদের সাথে সমানভাবে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে নিরাপদে বাস করার এবং চলাফেরা করার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক একমাত্র লক্ষ্য।’
রূদ্রাক্ষ রায়হান নামে এক ব্যক্তি অসুস্থ পুরুষ সদস্য নিয়ে এই বাসে নারীরা উঠতে পারবেন কি না এমন প্রশ্নও তোলেন। তিনি লেখেন, ‘পিংক বাসে একজন নারী তার বৃদ্ধ পিতা, পঙ্গু স্বামী কিংবা অসুস্থ প্রেমিককে নিয়ে উঠতে পারবে কি না? যদি না পারে তবে এইটা অমানবিক, যদি না পারে তবে এইটা বৈষম্য। আমাদের সকল বৈষম্যের বিষয়ে কথা বলতে হবে, শুধুমাত্র শরীরের গঠনের ভিন্নতার কারণে একজন মানুষ বিশেষ সুবিধা পাবে, এটা ভাবতেই কেমন যেন সাম্প্রদায়িক সাম্প্রদায়িক লাগে।’

আবার নারী এখন পাবলিক বাসে চড়লে হয়রানির শিকার হবেন- এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আহমেদ ইশতিয়াক নামে একজন ব্যক্তি। তিনি লেখেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা বাস ব্যাপারটাকে সাদা চোখে বেশ ভালো একটা স্টেপ মনে হয়। কিন্তু আমার এমন লাগে না। আমার ধারণা এই বাস নামানোতে সাধারণ বাসে নারীদের হ্যারাস করার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে।’
অনেকে আবার ‘নারী বাসে পুরুষের জন্য সামনের নয়টি সংরক্ষিত আসন থাকবে কি না’- কটাক্ষ করে এমন কথাও লিখেছেন। আবার উদ্বোধনের প্রথম দিনে ‘বলাকা’ পরিবহনের একটি বাস গোলাপি রংয়ের বাসকে ধাক্কা দিয়েছে- এটি লিখেও ফেসবুকে ট্রল করছেন অনেকে।
তবে নারীর জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। বাংলাদেশে এর আগে আরও দুইবার নারীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে একবার বিআরটিসি প্রথম এই একই উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার বেসরকারি উদ্যোগে ‘দোলনচাঁপা’ নামে ঢাকায় নারীদের জন্য বাস সার্ভিস চালু হয়েছিল। তবে কিছুদিন চলার পর সেসব বাসও আর চলেনি বা উদ্যোগ সফল হয়নি।
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে কী পরিমাণ কর্মজীবী নারী গণপরিবহনে যাতায়াত করছেন- এমন পরিসংখ্যান না থাকায় নারীর সুরক্ষা নিয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটি নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অতীতের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘আগেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও সেগুলো কেন টিকে থাকেনি সেটি আমলে নিতে হবে।’

একইসঙ্গে, পৃথিবীতে খুব কম দেশেই নারীদের জন্য এমন আলাদা বাস রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক নাসরীন।
তিনি বলেন, ‘কেন নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজন সরকার মনে করছে? কারণ একটা হলো নারীর নিরাপত্তা। যদি কয়েকটা ভাগে আমি বলি, একটা হলো যে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, যে ধাক্কাধাক্কি করে নারীকে উঠতে হচ্ছে, সেখানে নানা রকম অসম্মানজনক এবং যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ঘটে।
একইসঙ্গে, ‘পাবলিক’ শব্দটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ হলেও বাংলাদেশে সেটি পুরুষের বলে গণ্য করা হয়। ফলে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত মূল সমস্যার সমাধান না করে জিইয়ে রেখে পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও হয়রানি প্রতিরোধ হবে না বলে মনে করেন অধ্যাপক নাসরীন।
অন্যদিকে, সরকারের এই উদ্যোগটি নিয়ে এখনই নেতিবাচক চিন্তা না করে বরং অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত যথাযথ সময় দিয়ে এই প্রকল্পের মূল্যায়ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক।
যেহেতু গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না তাই এই উদ্যোগ সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ইতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তিনি।
অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘যেকোনো ডেভেলপমেন্টকেই একটু সময় দিতে হয়। ছয় থেকে এক বছর দেখতে হয় যে তার ইম্প্যাক্ট কী হচ্ছে। এখন সরকার যদি এই জায়গাটায় একটা ইনিশিয়েটিভ নেয় যে কিছুদিন পর দেখবে এই বাস চালুকরণে নারীদের মোবিলিটি আগের চাইতে বেড়েছে না কমেছে, নারী আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য ফিল করছে কি করছে না, এগুলো তো দেখার বিষয়। ওখান থেকে তখন আবার নিউ ইন্টারভেনশনে যাওয়া সম্ভব, তার আগে না।’
_20260820_033248517.jpg)
পৃথকীকরণ রাজনীতির মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ঢাবির অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন। একই ধরনের বক্তব্য দেন নারী অধিকারকর্মী সালমা আলীও।
গণপরিবহনে নারীরা সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়লেও মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন এখনো হয়নি। অথচ গণপরিবহনেই নারী সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হন।
সালমা আলী বলেন, আমি এটাকে কোনোভাবেই ক্রিটিসাইজ করতে চাই না। আমি মনে করছি এটা আরও বাড়ানো দরকার, স্পেসিফিক কিছু টাইমে মেয়েদের জন্য যদি বাস থাকে, তাহলে তারা কিন্তু স্বাচ্ছন্দে যেতে পারে।’
তবে নারীর জন্য আলাদা বাস চালু করে তাকে ক্ষমতায়ন করা যাবে কি না সেই প্রশ্ন তুলে সালমা আলী বলেন, ‘ক্ষমতায়নের কথা যদি বলি, সেখানে কিন্তু আমি নারী-পুরুষ একই কাতারে থাকতে চাই, তাই না? তখন আমাকে একটা সফট কালার দিয়ে আলাদা করে ফেলাটা ঠিক কি না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনও বলেন, ‘নারী-পুরুষের সমতার যে অঙ্গীকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, সেটা কিন্তু কখনো পৃথকীকরণের রাজনীতির মধ্য দিয়ে নয়।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ