আব্দুল হাকিম
১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১০ এএম
- দখল ও মাটি ভরাটে বাধাগ্রস্ত তুরাগের স্বাভাবিক প্রবাহ
- শিল্পবর্জ্যে ক্রমেই দূষিত হচ্ছে তুরাগের পানি
- পুনর্বাসন করা হবে তুরাগের তিন পাম্প হাউস
- বসানো হবে ৯১টি অক্সিজেন মেশিন
- পাড়জুড়ে গড়ে উঠবে ইকো-বাফার জোন
- অবৈধ দখল ঠেকাতে নেওয়া হবে কার্যকর উদ্যোগ
- নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে
বর্ষায় তুরাগের পানি ফুলে উঠলেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে যেন স্বস্তি নেই। কোথাও কালচে পানি, কোথাও ভাসছে প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা। নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য, দখল আর মাটি ভরাটে অনেক জায়গায় সংকুচিত হয়েছে নদীর গতিপথ। এর প্রভাব পড়ছে আশপাশের জনবসতিতে। সামান্য বৃষ্টিতেই মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, কালশী, উত্তরা ও বাউনিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী ও খালগুলো ঠিকমতো পানি সরাতে না পারায় বর্ষাকালে তাদের দুর্ভোগ বাড়ে। এমন বাস্তবতায় তুরাগ নদকে ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার।
রাজধানীর পাশের তুরাগ নদের দূষণ কমানো, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো, অবৈধ দখল ঠেকানো এবং নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য ফেরাতে ৫৬৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘মেট্রো ঢাকা প্রকল্প গোড়ানচটবাড়ী রিটেনশন পন্ড এবং তুরাগ নদ সুরক্ষা ও সংরক্ষণ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’ নামের প্রকল্পটি আজ বুধবার (১৯ আগস্ট) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৪২ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ৪২৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। অনুমোদন পেলে চলতি বছরই কাজ শুরু করে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
২০ কিলোমিটার নদীতে দূষিত পদার্থ অপসারণ
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি হবে তুরাগ নদের ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলাকায় জমে থাকা দূষিত পদার্থ অপসারণ ও নিষ্কাশন। এ কাজে প্রায় ২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনমিটার ক্রমপুঞ্জীভূত দূষিত পদার্থ সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন নথিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার বর্জ্য, কঠিন বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণের কারণে তুরাগের পানি ও নদীতল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর বিভিন্ন অংশে দখল ও মাটি ভরাটের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নদটির পানি ধারণ ও নিষ্কাশন সক্ষমতাও কমছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নদ খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত উন্নয়নকে একই প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু নদী পরিষ্কার করেই থেমে না থেকে নদীর আশপাশের পরিবেশ রক্ষায় ইকো-বাফার জোনও গড়ে তোলা হবে।
জলাবদ্ধতা কমানোর লক্ষ্য
তুরাগ নদ ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, কালশী, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস, ইস্টার্ন হাউজিং, বৃহত্তর উত্তরা, বিমানবন্দর ও বাউনিয়া এলাকার পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, তুরাগের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো গেলে এসব এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে জলাবদ্ধতার প্রকোপও কমতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তুরাগ নদ ও গোড়ানচটবাড়ী রিটেনশন পন্ড এলাকার সংরক্ষণ ও সুরক্ষা, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ দখল রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তুরাগ নদ ও এর আশপাশের পরিধি বরাবর ইকো-বাফার জোন উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে নদ
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, তুরাগ নদ গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বংশী নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার বিরুলিয়া ইউনিয়নে এসে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। এর একটি শাখা সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে কর্ণতলী নদে এবং প্রধান শাখাটি আমিনবাজার ইউনিয়নে বুড়িগঙ্গা নদে গিয়ে মিশেছে।
নদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৮৫ মিটার। এটি একটি মাঝারি আকারের বারোমাসি নদ। ঢাকার জন্য তুরাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো উজান থেকে আসা পানি বহন করে বুড়িগঙ্গায় পৌঁছে দেওয়া। অর্থাৎ রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গেও নদটির সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু নদটির দুই পাড়ে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূষণও বেড়েছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডায়িং মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। শিল্পবর্জ্যে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক ও ভারী ধাতু নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট করছে।
এর পাশাপাশি নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, মাটি ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নকাজের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে একদিকে পানি দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষায় পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সক্ষমতাও কমছে।
দূষিত পদার্থ অপসারণ
প্রকল্পের আওতায় তুরাগ নদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদে জমে থাকা বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ অপসারণের পাশাপাশি গ্র্যাব ড্রেজিং করা হবে। এর মাধ্যমে নদীর তলদেশে জমে থাকা পলি ও দূষিত পদার্থ সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নদীর পাড়ে ৫ হাজার ৩৫ মিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। দুই কিলোমিটার এলাকায় ইকোসিস্টেম উন্নয়নের কাজও থাকবে। কঠিন বর্জ্য নদে পড়া ঠেকাতে স্বয়ংক্রিয় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যান্ত্রিক ট্র্যাশ র্যাক স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পে ৯১টি ফাউন্টেন কাম এরেটর স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পানি গুণগত মান নিশ্চিত করতে একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি তিনটি পাম্প হাউস পুনর্বাসন করা হবে। এসব অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য ২২৬ বর্গমিটার আয়তনের একটি অফিস নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করা হবে।
>> আরও পড়ুন
অর্থায়ন দেবে বিশ্বব্যাংক
প্রকল্পটির অর্থায়নে বড় অংশ আসবে বিশ্বব্যাংক থেকে। ইআরডির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার বিষয়ে গত ১৯ জানুয়ারি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে ঋণের বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এবং ঋণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আসবে বৈদেশিক ঋণ থেকে। ফলে বড় ধরনের বৈদেশিক অর্থায়নের মাধ্যমে ঢাকার আশপাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ হিসেবে প্রকল্পটিকে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। তবে নদ পুনরুদ্ধারে শুধু প্রকল্প নেওয়াই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন পানি ও পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার ‘ব্লু-নেটওয়ার্ক’ উন্নয়নের অংশ
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলো পুনরুদ্ধার এবং ব্লু-নেটওয়ার্ক উন্নয়নের জন্য নদীর পরিবেশগত অবস্থা ও পানির গুণমান উন্নত করা জরুরি। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং খাল পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে।
রাজধানীর চারপাশের নদী ও খালগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত জলপথ হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে প্রকল্প প্রস্তাবে। কারণ একটি নদ বা খালের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব আশপাশের অন্য জলাধার ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাতেও পড়ে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সেই সমন্বিত উদ্যোগেরই একটি অংশ। এর মাধ্যমে তুরাগের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত অবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করা হবে।
বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ
পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে তুরাগ নদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে শুধু দখল ও দূষণকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। নগর ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাপ, নদীর উচ্চ ও নিম্ন প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত নগরায়ণের ফলে খোলা জায়গা ও জলাধারের পরিমাণ কমছে। বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ায় অল্প সময়ে বিপুল পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু নদী ও খালগুলোর ধারণক্ষমতা কমে গেলে সেই পানি দ্রুত সরতে পারে না। তখনই জলাবদ্ধতা বাড়ে।
তুরাগের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ তাই শুধু নদ সংরক্ষণ নয়, রাজধানীর জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে মিরপুর থেকে উত্তরা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।
‘নদ বাঁচলে শহরও বাঁচবে’
রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে দূষণ ও দখলের চাপে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নদ উদ্ধার ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। একদিকে নদ পরিষ্কারের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আবার নদে বর্জ্য পড়ছে। কোথাও উচ্ছেদের পরও ফিরে এসেছে দখল। এ কারণে তুরাগ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগে নদের তলদেশ পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি গুণগত মান, পাম্প হাউস, ইকোসিস্টেম এবং নদীর পাড়ের উন্নয়নকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তুরাগ নদ ও গোড়ানচটবাড়ী রিটেনশন পন্ড সংরক্ষণ ও সুরক্ষার পাশাপাশি অবৈধ দখল রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আশপাশের বড় এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। এখন প্রকল্পটির অনুমোদনের দিকে তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। আজ একনেকে অনুমোদন পেলে ২০২৬ সাল থেকেই কাজ শুরুর সুযোগ তৈরি হবে। লক্ষ্য ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা।
তিনি বলেন, তুরাগের তীরে বসবাসকারী মানুষের জন্য বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ ও নগরজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ভুমিকা রাখবে নদটি। সেই ব্যবস্থা সচল রাখা গেলে নদ যেমন বাঁচবে, তেমনি ঢাকার বড় একটি অংশও জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
এএইচ/এএস