জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩০ এএম
শিশু অবস্থায় দেশ ছেড়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। বাবার সঙ্গে প্রথমে পাকিস্তান যান। সেখানে তার দুই পা কাটা পড়ে। এরপর দালালরা তাকে তুরস্কে নিয়ে যায়। এরপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর দেশে ফিরেন তিনি। দিনভর চেষ্টার পর অবশেষে তার পরিবারের সন্ধান পেয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। ব্র্যাক জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৫টার দিকে টি কে ৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ।
দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে আসা ফরিদ ভালোভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছিলেন না। তিনি শুধু নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং কয়েকটি বিচ্ছিন্ন তথ্য দিতে পারছিলেন। বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে তাকে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর তার সঙ্গে কথা বলে সকাল থেকেই তার পরিবারের সন্ধানে কাজ শুরু করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় দেশে ফেরার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ফরিদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তার পরিবারের সন্ধান করা। তার কাছে খুব সীমিত তথ্য ছিল, বাংলাতেও তিনি ভালোভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। আমরা সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দিই এবং কক্সবাজারের আমাদের সহকর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগানো হয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিকেলেই আমরা তার পরিবারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাই এবং পরে তার বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করি।
আরও পড়ুন: ৩ জেলার ডিসি প্রত্যাহার
ফরিদ জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে, তার বয়স যখন আনুমানিক ১০ বছর, তখন তিনি তার বাবা মো. আয়ুব আলীর সঙ্গে জাহাজে করে পাকিস্তানে যান। সেখানে বোধহয় তার পা কাটা পড়ে। প্রায় ১০ বছর থাকার পর দালালরা তাকে সড়কপথে তুরস্কে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না।
ব্র্যাকের কক্সবাজার মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় মরিচ্যা পালং এলাকার নাছির পাড়ায় গিয়ে ফরিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিবারটি জানায়, ফরিদের বাবা মো. আয়ুব আলী বর্তমানে পাকিস্তানে রয়েছেন। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। ফরিদ তাদের বড় ছেলে। দালালের মাধ্যমে তুরস্কে যাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে তার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
ফরিদের ভাইয়ের নাম ছৈয়দ আলম। তাকে দ্রুত ঢাকায় এনে ফরিদের সঙ্গে দেখা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
শরিফুল হাসান বলেন, ৩৫ বছর পর একজন মা তার সন্তানকে ফিরে পাবেন, একজন ভাই তার ভাইকে ফিরে পাবেন—এর চেয়ে মানবিক পাওনা আর কী হতে পারে! আমরা খুব দ্রুত ফরিদের ভাইকে ঢাকায় এনে তার সঙ্গে দেখা করিয়ে তাকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। একজন মানুষকে তার স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের।
তিনি আরও বলেন, ফরিদের পরিবারের সন্ধান পাওয়ার এই কাজে কক্সবাজারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমাদের সহকর্মীরা যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। বিশেষ করে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কক্সবাজার টিমকে ধন্যবাদ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন আরও মানুষকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম দেশে ফেরত আসা বিপদাপন্ন ও অসহায় অভিবাসীদের বিমানবন্দর থেকে সহায়তা, কাউন্সেলিং, পরিবার শনাক্তকরণ ও পুনঃএকত্রীকরণসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে থাকে।
এমআইকে/এআরএম