আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং এর জেরে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রধান আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লির এই কূটনৈতিক যোগাযোগ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এই সফর একটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে—আঞ্চলিক রাজনীতিতে কি ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব ও গুরুত্ব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে?
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ভারতের ভূমিকা ছিল মূলত একপাক্ষিক। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দিল্লির সুদৃঢ় ও একচেটিয়া সম্পর্ক থাকার কারণে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করেছিল নয়াদিল্লি। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দিল্লিকে তার দীর্ঘদিনের নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দিল্লি সফর শুধু একটি সাধারণ রাজনৈতিক সফর নয়, বরং এটি ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসির একটি বড় ইউ-টার্ন বা কৌশলগত পরিবর্তন। দিল্লি বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশের জনগণকে উপেক্ষা করে শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর বাজি ধরা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ফলে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ প্রমাণ করে যে ভারত এখন বাংলাদেশের সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
ভারতের সংসদীয় কমিটি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বাংলাদেশের এই পটপরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ১৯৭১ সালের পর ভারতের জন্য ‘সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে চলমান আলোচনার মাঝে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতের শীর্ষ কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি। তার মতে, এই সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সোমবার ভারতীয় বার্তা সংস্থা- এএনআই দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে অনেক বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ বিষয়ে দুই দেশ একমত হলেও পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।’
তিনি আর বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধানেও বাংলাদেশ ভারতের আরও সক্রিয় ভূমিকা চায়। এক্ষেত্রে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা ছাড়া ভারতের তেমন কিছু করার নেই। কারণ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ভারতের কথা শুনতে পারে’।
ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক যোগাযোগের এই বর্তমান সুযোগকে কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন ভারতীয় সাবেক এই কূটনীতিক।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যদি ভারত সফরে না আসেন, তাহলে এই সুযোগের জানালাটি বন্ধ হয়ে যাবে। এই যোগাযোগের চ্যানেলটি খুব বেশি দিন খোলা থাকবে না। এই সুযোগ আমরা বা তারা কেউই হাতছাড়া করতে চাইব না’।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে দুটো শর্তের কথা বলেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরমধ্যে রয়েছে- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছে ঢাকা।
তারেক রহমানের এই সফরের সমান্তরালে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামগ্রিক প্রভাব কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো নিয়ে জোরালো আলোচনা করছেন বিশ্লেষকরা। এর পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে—
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর কেবল একটি নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বা দলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে পরিবার কিংবা মালদ্বীপে ভারতপন্থী সরকারগুলোর পতনের পর দিল্লি চরম কৌশলগত সংকটে পড়ে। যখনই কোনো দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, সেখানেই ভারতের প্রভাব বড় ধাক্কা খেয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহ্যগত ‘প্রভাব বলয়’ চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রবেশ ভারতের গুরুত্ব কমার অন্যতম প্রধান কারণ। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং এমনকি বাংলাদেশেও চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নিয়ে হাজির হয়েছে।
আর অর্থনৈতিক সংকটে পড়া এই দেশগুলো এখন দিল্লির ঋণের চেয়ে বেইজিংয়ের আর্থিক সহায়তার দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা দিল্লির ভূ-রাজনৈতিক একচেটিয়া আধিপত্যকে ভেঙে দিয়েছে।
নেপাল, ভুটান বা মালদ্বীপের মতো ছোট প্রতিবেশী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বিরুদ্ধে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং ‘দাদাগিরি’ বা বিগ ব্রাদার মনোভাবের অভিযোগ তুলে আসছে। মালদ্বীপের সাম্প্রতিক ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন এবং নেপালের নতুন মানচিত্র বিতর্ক এর বড় উদাহরণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেশীদের এই ক্ষোভকে ভারত সময়মতো প্রশমিত করতে পারেনি, যার ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। যার ফলে এই মূহুর্তে বাংলাদেশেকে পাশে চাইছে নরেন্দ্র মোদির সরকার।
একই সঙ্গে তারেক রহমানের দিল্লি সফর ভারতের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকালে সম্পর্কের অবনতি ক্ষেত্রে একটি ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষতিপূরণের চেষ্টা। ভারত এখন বুঝতে পারছে, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা এবং ট্রানজিট সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নয়াদিল্লির জন্য জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ভারত বিএনপির শাসনকালকে চরমপন্থার উত্থান হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তারেক রহমান আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশের মাটি কোনো আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এছাড়াও ভারসাম্যের রাজনীতি তারেক রহমান অত্যন্ত চতুরতার সাথে চীনের সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখছেন। ফলে ভারত একতরফা চাপ সৃষ্টির সুযোগ হারাচ্ছে এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে বিএনপি এখন অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিকরা বলছেন, তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। এটি যেমন একদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরার গ্রহণযোগ্যতাকে আন্তর্জাতিকভাবে মজবুত করেছে, তেমনি অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতাকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভারত এখন আর প্রতিবেশীদের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার একক ক্ষমতা রাখে না।
তাদের মতে, যদি ভারত তার পুরোনো ‘বিগ ব্রাদার’ মনোভাব থেকে বের হয়ে এসে পারস্পরিক সমতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীতি নির্ধারণ না করে, তবে আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির প্রভাব আরও সংকুচিত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
সূত্র: এএনআই, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, বিবিসি বাংলা
এমএইচআর