মো. মেহেদী হাসান হাসিব
১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের নিয়ম প্রবাসীদের জন্য কিছুটা শিথিল করার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের এনআইডির তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে বিদেশি নথিপত্র বিবেচনায় নিয়ে সহজে সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য এনআইডি সংশোধনের বিদ্যমান স্ট্যার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) কিছুটা শিথিল করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ যাতে প্রবাসী পরিচয় ব্যবহার করে এনআইডি সংশোধনের সুযোগ না পান, সে বিষয়ে সতর্ক থাকবে ইসি।
কী ধরনের শিথিল করা হতে পারে জানতে চাইলে সূত্র জানায়, বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের বিদেশি কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে সংশোধনের জন্য বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রবাসী হিসেবে প্রমাণের জন্য পাসপোর্টের পাশাপাশি জব আইডি, রেসিডেন্স কার্ড, বিএমইটি কার্ড, ভিসা পেপারস, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে অনলাইন ডকুমেন্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, প্রবাসীদের জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের জন্মের ক্রমানুসার এবং বাবা-মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে বয়সের যৌক্তিক পার্থক্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ওয়ারিশ বা পারিবারিক উত্তরাধিকার সনদের কথা বলা হয়েছে। ওই সনদে পরিবারের সদস্যদের এনআইডি নম্বর অথবা এনআইডি না থাকলে ভাই-বোনের জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ কিংবা পাসপোর্টের তথ্য সংযুক্ত করতে হবে। প্রকৃত প্রবাসী ছাড়া অন্য কোনো আবেদনকারী যাতে প্রবাসী পরিচয়ে এনআইডি সংশোধনের সুযোগ না পান, সে জন্য পাসপোর্টের বিদেশ গমন ও দেশে ফেরার তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিএমইটি ও ইমিগ্রেশন ডাটাবেজের সঙ্গে এনআইডি তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কিছুই আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট করে বলা যাবে, কতটুকু শিথিল করা হলো।
আরও পড়ুন: ব্যক্তি পর্যায়ে এনআইডি যাচাইয়ে নতুন অ্যাপ আনছে ইসি
প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়া শিথিল করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এনআইডি অন্যান্য সাধারণ কার্ডের মতো নয়। এর সঙ্গে বিচারিক, উত্তরাধিকার, আইনি, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় জড়িত। তাই প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুসরণ করে বাস্তবভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কেস-বাই-কেস সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধন-সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় নিয়ে ওয়ার্কশপ করা হবে। ওয়ার্কশপে পাওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন সেবা দিতে বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই; সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা; যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহাম; ইতালির রোম ও মিলান; কুয়েতের কুয়েত সিটি; কাতারের দোহা; মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর; অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ও সিডনি; কানাডার অটোয়া ও টরন্টো; জাপানের টোকিও; যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মিয়ামি, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস; মালদ্বীপের মালে; ওমানের মাসকাট; এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়াসহ মোট ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন করে সুইডেন, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড—এই পাঁচটি দেশে কার্যক্রম শুরু হলে এ সংখ্যা বেড়ে ১৯টি দেশে পৌঁছাবে।
কুমিল্লার বাসিন্দা নাহিদ ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। ইতোমধ্যে তিনি তার এনআইডি সংশোধন করতে নির্বাচন ভবনে এসেছেন। এনআইডি সংশোধনের বিষয়ে কথা হলে তিনি ঢাকামেইলকে বলেন, আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তাদের বেশিরভাগের এনআইডিতে বয়সের সমস্যা থাকে। তাই আমি মনে করি, প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্টসহ বিদেশি যেসব ডকুমেন্ট রয়েছে, তা আমলে নিয়ে কোনো জটিলতা না থাকলে এনআইডির তথ্য সংশোধন করে দেওয়া হোক। কারণ আমরা তো বয়স সংশোধন করে আর দেশে থাকব না কিংবা কোনো চাকরি নেব না। আমরা বিদেশে চলে যাব।
আরও পড়ুন: এনআইডি সংশোধন সহজ করতে কমিটি গঠন ইসির
এনআইডি সংশোধনের আবেদন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ—এই ছয় ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করে ইসি। আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্ধারণ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ক-১ ক্যাটাগরিতে করণিক ভুল ও স্বাক্ষর পরিবর্তনের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার। মূল নাম ঠিক রেখে বানান সংশোধনের আবেদন ক ক্যাটাগরিতে রাখা হয়, যা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করেন।
বানান পরিবর্তনের কারণে নামের পরিবর্তন হলে তা খ ক্যাটাগরিতে পড়ে এবং জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তা নিষ্পত্তি করেন। পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদন গ ক্যাটাগরিতে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ধর্ম পরিবর্তনের কারণে নাম বা শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের আবেদন খ-১ ক্যাটাগরিতে অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করেন। খ ও খ-১ ক্যাটাগরির বাতিল আবেদন নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। বয়স সংশোধনের আবেদন ঘ ক্যাটাগরিতে পড়ে, যার নিষ্পত্তির ক্ষমতা শুধু এনআইডি মহাপরিচালকের।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আবেদন বাতিল হলে আপিলের সুযোগ রয়েছে। আপিল কর্তৃপক্ষ সচিব। সচিবের মাধ্যমে তথ্য সংশোধন হলেও কমিশনের কাছে রিভিশনের সুযোগ রয়েছে।
জানা যায়, ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর সাত মাসে এনআইডি সংশোধনের মোট আবেদন জমা পড়েছে ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি। এসব আবেদনের মধ্যে ৬২ লাখ ৩০ হাজার ৫৯২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ৯৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৬১ হাজার ১৪৬টি আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন কারণে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫৪টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে দেড় লাখের মতো আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এমএইচএইচ/এআর