মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
- প্রতিশ্রুতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাস্তবে সংকট আরও গভীর
- এলএনজি সংকটে শিল্প, গ্যাসের টানাটানিতে বিদ্যুৎ
- তেলের বাজারেও স্বস্তি মেলেনি ছয় মাসে
- উদ্যোক্তাদের পুরোনো শঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে
- উদ্যোগ আছে, তবে ফল পেতে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ
- ১৮০ দিনের হিসাব: প্রতিশ্রুতির চেয়ে সংকটই বেশি দৃশ্যমান
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১৮০ দিনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিল। নির্বাচনি ইশতেহারেও ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি। ব্যবসায়ীরাও সরকার গঠনের শুরুতেই শিল্পকারখানা সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।
কিন্তু ছয় মাস শেষে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের চিত্রে স্বস্তির চেয়ে সংকটই বেশি দৃশ্যমান। কখনো জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, কখনো ভয়াবহ লোডশেডিং, আবার কখনো গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। সর্বশেষ এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের পর দেশের বড় একটি অংশে গ্যাস সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বহু শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যত থমকে গেছে।
সরকার বলছে, বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। সংকট মোকাবিলায় নতুন এলএনজি টার্মিনাল, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক জ্বালানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বেশির ভাগের ফল পেতে সময় লাগবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ছয় মাস বা এক বছরে সমাধান করা সম্ভব নয়, এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাস্তব অগ্রগতি কতটা হলো? সংকট সামাল দিতে নেওয়া উদ্যোগগুলো কি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরি করছে, নাকি আপাতত সংকট ব্যবস্থাপনাতেই আটকে আছে সরকার?
প্রতিশ্রুতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাস্তবে সংকট
সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারে ছিল বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথাও ছিল। কিন্তু ছয় মাসের শেষ দিকে এসে গ্যাস সংকটই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পকারখানা থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন থেকে বাসাবাড়ি পর্যন্ত এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের অভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও সংকটকে সাময়িক নয়, কাঠামোগত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট গ্যাস চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার কারখানাগুলোর চাহিদার ৩৮ শতাংশ পূরণ করা গেছে।
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীরের বলেন, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে যাওয়া এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতিই বর্তমান সংকটকে গভীর করেছে। দেশের জ্বালানি সংকট এখন একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে।

এলএনজি টার্মিনালে বিপর্যয়, শিল্পে ধাক্কা
গত কয়েক বছরে দেশের গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও এলএনজি কার্গো নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। একটি কার্গো থেকে সরবরাহ নিয়ে জটিলতার কারণে সংকট আরও তীব্র হয়। পরে বিকল্প কার্গো এনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় সরকার।
এতে বোঝা যায়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো বড় অংশে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, কার্গো সরবরাহ কিংবা টার্মিনালের যেকোনো সমস্যা সরাসরি দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে আঘাত করছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের সংযোগের জন্য অর্থ জমা দিয়েও শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পও পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।

গ্যাসের পরিণতি বিদ্যুৎ খাতে
গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমে যায়।
জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের শুরুতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দেয়। কোনো কোনো এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ ওঠে। শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। একপর্যায়ে দেশে লোডশেডিং কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো হলে আবার শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। অর্থাৎ সংকট মোকাবিলায় এক খাতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অন্য খাতকে চাপের মধ্যে পড়তে হয়েছে।
এখানেই সরকারের জন্য বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কেন সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না?
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও স্বীকার করেছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা পর্যাপ্ত হলেও সঞ্চালনব্যবস্থা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তেলের বাজারেও ছয় মাসে বড় ধাক্কা
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেলও গত ছয় মাসে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সময়ে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আতঙ্কে দেশের বাজারে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি তেল বিক্রি হওয়ায় মজুত কমে যায়।
একপর্যায়ে জ্বালানি তেল রেশনিং করতে হয়। এতে পাম্পে দীর্ঘ সারি, তেল না পাওয়ার ভোগান্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে রেশনিং তুলে নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়। পেট্রোল ও অকটেনের দামও বাড়ানো হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের জ্বালানি তেলের মজুত ৬০ দিনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
শিল্পোদ্যোক্তাদের পুরোনো আশঙ্কাই সত্যি
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই শিল্পোদ্যোক্তারা সতর্ক করেছিলেন, নতুন বিনিয়োগের আগে বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলো সচল করা জরুরি। মার্চ মাসে এক সংলাপে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছিলেন, নতুন বিনিয়োগে মনোযোগ দেওয়ার আগে বিদ্যমান উৎপাদন ইউনিটগুলো সচল করতে হবে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার কারণে প্রায় ৩০০ তৈরি পোশাক ও ৫০টি টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়েছে। কার্যাদেশ থাকার পরও এলসি খোলার জন্য ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেছিলেন, দেশে রাস্তা, সেতুসহ অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু জ্বালানির অভাবে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগও হচ্ছে না।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত উৎপাদন, রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতি।
সরকার বলছে, সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বর্তমান সংকটের দায় আগের সরকারের ওপর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেছেন, বর্তমান সময়ে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের জন্য বর্তমান সরকার দায়ী নয়। তার মতে, আগের সরকারের দীর্ঘ সময়ের ভুল পরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার ফল এখন সরকারকে সামলাতে হচ্ছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, আগের সরকারের ভুল পরিকল্পনার খেসারত বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় নতুন দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সংকটের উত্তরাধিকার যতই পুরোনো হোক, দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায় বর্তমান সরকারেরই। আর সেই জায়গা থেকেই ১৮০ দিনের মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি কতটা তৈরি করা গেছে।
উদ্যোগ আছে, ফল পেতে সময় লাগবে
সরকার বলছে, গ্যাস সংকট সমাধানে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো সাড়া দিলে আগামী কয়েক বছরে নতুন মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এ ছাড়া তৃতীয় একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থলভাগে গ্যাস সংরক্ষণাগার তৈরির পরিকল্পনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল নিয়েও কাজ করছে সরকার। কিন্তু এসব উদ্যোগের কোনোটিই রাতারাতি সংকট সমাধান করবে না।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করে বলেছেন, গ্যাস হুট করে আনার কোনো জাদু সরকারের হাতে নেই। দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ায় এখন নতুন অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এতে অন্তত দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
তার মতে, নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরিতেও দেড় থেকে দুই বছর সময় প্রয়োজন। তাই আগামী দুই বছর সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতির অপেক্ষা
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হচ্ছে একটি সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নীতি প্রকাশ করা হতে পারে।
এই নীতিতে গ্যাস, কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ জ্বালানি মিশ্রণ নির্ধারণ করা হবে। কোথায় কত জ্বালানি প্রয়োজন এবং কোন উৎস থেকে কতটা সরবরাহ করা হবে, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এতে থাকার কথা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সঞ্চালন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং এলএনজি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সিপিডিও এলএনজি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও ব্যয়-সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা, টার্মিনাল ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
১৮০ দিনের মূল্যায়ন: কোথায় অগ্রগতি, কোথায় ঘাটতি
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে একেবারে ব্যর্থ বলা যায় না। জ্বালানি সংকট সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানি, নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ, সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা এবং পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় জ্বালানি তেল সরবরাহে অস্থিরতা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় রেশনিংও তুলে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতার বিচারে বড় ঘাটতিও স্পষ্ট। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়নি। শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। সঞ্চালনব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সবচেয়ে বড় বিষয়, সরকারের ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগগুলোর ফল এখনো দৃশ্যমান নয়।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
সরকারের ১৮০ দিনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম ছিল বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। তবে বাস্তবে এ সময়ে গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বছরের পরের সময়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের জ্বালানি সরবরাহে তেল ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে সাগরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে এর ফল পেতে আরও সময় লাগবে।
অন্যদিকে, আমদানিনির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতির বিপরীতে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি এখনো প্রণয়নাধীন। ফলে ১৮০ দিনে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর অধিকাংশের বাস্তব ফল পেতে আরও সময় লাগবে।
সামনে সবচেয়ে কঠিন দুই বছর
সরকারের ১৮০ দিনের হিসাব তাই মিশ্র। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা যে স্বস্তি চেয়েছিলেন, তার বড় অংশই এখনো পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তার সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংকট যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগ দুটিই চাপে পড়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রফতানি, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী নিজেই যখন বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট কাটাতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে, তখন সরকারের সামনে আগামী সময়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ছয় মাসে সরকার সংকটের অনেকগুলো কারণ শনাক্ত করেছে। এখন প্রয়োজন তার দৃশ্যমান সমাধান।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কত দ্রুত এগোয়, নতুন এলএনজি টার্মিনাল কত দিনে চালু হয়, সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নতি কতটা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা রূপ নেয় এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী মূল্যায়ন।
১৮০ দিনে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সংকটই বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। এখন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, আগামী দুই বছরে এই সংকটকে স্থায়ী সমাধানের পথে নেওয়া। কারণ জ্বালানি ছাড়া শিল্প চলে না, শিল্প ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ে না, আর বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতিতে টেকসই গতি ফেরানো কঠিন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ৩০ থেকে ৩৬ মাসের আগে নতুন এফএসআরইউ কার্যকর করা আসলেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এটি বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে এটি কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের সরকার। এসব কাজ করতে গিয়ে আমরা কোনো জায়গায় দেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করব না। সরকারের ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে।’
এমআর/এএস