Dhaka Mail Logo

জাতীয়

নিয়োগ-পদায়ন-পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনা বন্ধের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:১১ পিএম

স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে দেশের আমলাতন্ত্র বারবার রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক আমলা, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের মতে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে। 

এর ফলে প্রশাসনের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ থাকায় প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আসছে না।

এই পরিস্থিতিতে রাজনীতির প্রভাব থেকে আমলাতন্ত্রকে মুক্ত করে মেধা, দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের প্রতিকারের জন্য ‘সিভিল সার্ভিস ন্যায়পাল’ (ওম্বুডসম্যান) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও গবেষকেরা। 

একইসঙ্গে সচিব ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান নিয়োগে বিশেষ সংসদীয় কমিটির অনুমোদন এবং নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (সিইপিএএ) আয়োজিত ‘রাষ্ট্র গঠন ও আমলাতন্ত্র: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

আলোচনায় গভর্ন্যান্স গবেষক ও সিভিল সার্ভিস বিশেষজ্ঞ ড. ইউসুফ জারিফের লেখা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে আইনগতভাবে আমলাতন্ত্রকে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা থাকলেও বিভিন্ন সময়ের শাসকেরা প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন। এর ফলে আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাসক শ্রেণি নির্বাচনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নীতি নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করতে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিকীকরণ করেছে বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, গত পাঁচ দশকে বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা হয়েছে এবং দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। অথচ আধুনিক রাষ্ট্র আমলাতন্ত্র ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না। একটি দুর্বল ও অপেশাদার আমলাতন্ত্র শেষ পর্যন্ত দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দেয়।

অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় আমলাতন্ত্র পেশাদার না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্র গঠনের এজেন্ডা বহুলাংশে ব্যাহত হয়।’

আলোচনায় বর্তমান সরকারের সময়ের প্রশাসনিক বাস্তবতাও উঠে আসে। লিখিত প্রবন্ধে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব নিলেও জনপ্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তনে তেমন সাফল্য আসেনি। জনপ্রশাসন সংস্কারে কমিশন গঠন করা হলেও তার কার্যকর সুফল পাওয়া যায়নি।

বর্তমান সরকারের বয়স তুলনামূলক কম হলেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে মেধাবী কর্মকর্তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা এবং সচিব ও বিভিন্ন সংস্থার প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়।

অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম বলেন, দেশের বেকারত্ব, বিনিয়োগ মন্দা, শিক্ষার গুণগত সংকট ও সুশাসনের ঘাটতি মোকাবিলায় কার্যকর ও পেশাদার আমলাতন্ত্র অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় প্রশাসনে প্রত্যাশিত গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ ঠেকাতে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ব্যবহারের প্রথা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বক্তারা মনে করেন, কোনো কর্মকর্তার পেশাগত দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়। তাই এসব ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস ওম্বুডসম্যান বা ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন গবেষক ড. ইউসুফ জারিফ। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের ‘মেরিট প্রোটেকশন কমিশন’-এর আদলে এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত, যেখানে নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি বা পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা প্রতিকার চাইতে পারবেন।

এছাড়া সচিব ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান নিয়োগে বিশেষ সংসদীয় কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য রাখার কথাও বলা হয়।

সাবেক সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, পরিকল্পিতভাবে দেশের আমলাতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শাহজাহান খান বলেন, শুধু সংস্কার করলেই হবে না, দেশের আমলাতন্ত্রের পুনর্র্নিমাণ প্রয়োজন।

আলোচকেরা বলেন, বিগত সরকারগুলো দলীয় স্বার্থে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলের সহযোগী কাঠামোয় পরিণত করেছে। এর ফলে প্রশাসনের পেশাগত নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জবাবদিহি কমেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে।

বক্তারা বলেন, পেশাদার ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন। তাই প্রশাসনে নিয়োগ থেকে শুরু করে পদায়ন ও পদোন্নতি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মেধা, দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।

তাদের মতে, রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মকর্তাদের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ একটি স্থায়ী, দক্ষ ও নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিসই হওয়া উচিত বাংলাদেশের প্রশাসনের ভিত্তি।

মূল প্রবন্ধে আমলাতন্ত্রকে সুরক্ষা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—

১. বিভিন্ন দেশের মেরিট প্রটেকশন কমিশনারের আদলে বাংলাদেশে ‘সিভিল সার্ভিস ওমবাডসম্যান’ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা প্রতিকার পান।

২. সচিব ও সংস্থাপ্রধান নিয়োগে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা। সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নৈতিকতা, সততা, আর্থিক অবস্থা, সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক দক্ষতা যাচাই।

৩. বর্তমান সিনিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) কার্যকর নয় দাবি করে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো প্রশাসনিক কাঠামো বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি পদায়ন ও পদোন্নতির নীতিমালা স্পষ্ট করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ এবং নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন গ্রহণ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

৪. পদোন্নতি পাওয়া বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপনের ব্যবস্থা করা। পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের কী কারণে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা তথ্যের অধিকার হিসেবে তাদের জানানো।

৫. সিভিল সার্ভিসের জন্য বাধ্যতামূলক ‘নৈতিক ও জবাবদিহি নীতিমালা’ প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিগত সরকারগুলো দলীয় স্বার্থে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত করেছিল। এর ফলে দেশে নির্বিচারে অর্থ পাচার হয়েছে এবং নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।

আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহিমূলক, নৈতিক ও পেশাগত দক্ষতায় শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা। তাদের মতে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত আমলাতন্ত্র দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আলোচকরা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়লস সিস্টেম’-এর অপব্যাখ্যা দিয়ে আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিকীকরণ করা হচ্ছে। গত অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অনেক সচিবের চুক্তি বাতিল হলেও জনপ্রশাসন সচিব ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবের চুক্তি বাতিল না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। তাদের মতে, এতে নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন ধরনের বার্তা যায়।

আমলাতন্ত্রকে পেশাদার করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান আলোচকরা। সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি করপোরেশনে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগের বিষয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জনপ্রশাসনকে সরকারি দলের কার্যালয়ে পরিণত করা হলে তা দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে উল্লেখ করে সরকারকে এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তারা।

সিইপিএএ’র প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে সংলাপে সাবেক সচিব ও গবেষক ড. মাহফুজুল হক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খন্দকার রাশেদুল হক, সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম, সাবেক সচিব মিজ আলেয়া আক্তার, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, দৈনিক ওয়াদার প্রধান সম্পাদক শফিকুল আলম, অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলামসহ সাবেক আমলা, শিক্ষক ও গবেষকরা বক্তব্য দেন। 

এএইচ