১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৯ এএম
শনিবারের সকাল। অফিস নেই, ফাইলের তাড়া নেই, মন্ত্রীর ফোন নেই—অর্থাৎ আজ রাষ্ট্রও যেন একটু হাঁফ ছাড়তে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের হাঁফ ছাড়ার সুযোগ কম। একদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক ঘড়িতে টিকটিক শব্দ, অন্যদিকে দেশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কারখানার চাকা কাশছে; আর সমুদ্রের ওপারে হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকা ও ইরান এমন এক দড়ি টানাটানি করছে, যার এক প্রান্তে তেলের দাম আর অন্য প্রান্তে আমাদের রান্নাঘরের চুলা। পৃথিবীটি যে গোল—এ কথা ভূগোলের বইয়ে পড়েছিলাম; এখন বুঝছি, গোল বলেই তার সব বিপদ ঘুরে ঘুরে আমাদের উঠোনে আসে।
প্রথমে দিল্লির গল্পটি বলা যাক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি আগস্টে দুই দিনের ভারত সফরের প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তে এগিয়ে চলছে। ২১ ও ২২ আগস্ট সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে দিল্লি প্রস্তাব করেছে; ঢাকা এখনো সময়সূচি চূড়ান্ত করেনি। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর থাকার জন্য হোটেলও দেখা হচ্ছে বলে খবর। সবকিছু ঠিকঠাক হলে এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারা তাকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছে। সফরটি তাই নিছক প্রোটোকলের ব্যাপার নয়। দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের গতিপথ, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে এই সফরের টেবিলে এসে বসবে। হোটেলের ঘরটি পাঁচতারা হলেই হবে না; আলোচনার টেবিলটিও যেন পাঁচতারা হয়—অর্থাৎ মর্যাদা, স্বার্থ ও পারস্পরিকতার দিক থেকে।
এদিকে বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশ কম রোমান্টিক! গ্যাসের চাপ এমন পর্যায়ে নেমেছে যে অনেক কারখানায় যেখানে ১৫–২০ পিএসআই প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১–২ পিএসআই। শিল্পমালিকদের ভাষ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, রি-রোলিং ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে উৎপাদন তলানিতে। অতিরিক্ত জ্বালানি কিনে জেনারেটর চালালে উৎপাদন খরচ বাড়ে, না চালালে উৎপাদন বন্ধ—ব্যবসায়ীর সামনে যেন দুই দরজা, দুটোতেই তালা। গতকাল অবশ্য সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে আবার সরবরাহ শুরু হয়েছে; সন্ধ্যা থেকে প্রায় ১১০ এমএমসিএফডি দিয়ে শুরু করে রাতের মধ্যে তা প্রায় ৫৫০ এমএমসিএফডিতে ওঠার কথা জানানো হয়েছে। আশা করা যায় এতে সংকট কিছুটা কমবে। কিন্তু এই ‘কিছুটা’ শব্দটির সঙ্গে শিল্পনীতি চালানো যায় না। শিল্পের চাকা একবার থেমে গেলে তাকে আবার ঘোরাতে শুধু গ্যাসের ভাল্ভ খুললেই হয় না—আস্থা, অর্থপ্রবাহ, ব্যাংক ঋণ এবং বাজারের নিশ্চয়তাও খুলতে হয়।
এই সংকটের সঙ্গে আরও এক করুণ খবর এসে জুড়েছে—এলএনজি জাহাজ কাটার সময় গ্যাসমুক্ত না করায় বিষক্রিয়ায় প্রাণহানির ঘটনা। সংখ্যাটি আমাদের কাছে নয়টি মানুষ; তাদের পরিবারের কাছে নয়টি পৃথিবী। জ্বালানি নিয়ে যে দেশ এত কথা বলে, সেই জ্বালানির জাহাজ কাটার সময় নিরাপত্তা যদি শেষ বিবেচনা হয়, তবে আমাদের উন্নয়নের অভিধানে একটি শব্দ খুব সম্ভবত হারিয়ে গেছে—মানুষ। শিল্প নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি উৎপাদনের প্রথম শর্ত।
দেশের অর্থনীতি যখন গ্যাসের সন্ধানে, তখন প্রধানমন্ত্রী আজ অবসরে যাওয়া প্রায় ৭০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের পাওনা অর্থ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। অবসরের পর পাওনা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করা শিক্ষকদের দুর্ভোগ কমাতে সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বস্তির। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত বোধ হয় তখনই, যখন তার কোনো নাগরিক দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজের প্রাপ্যটুকু হাতে পান। শিক্ষক জীবনে মানুষকে ভবিষ্যৎ শেখান; অবসরে এসে তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তায় না পড়ে—এটুকু রাষ্ট্রের কাছে খুব বড় দাবি নয়।
এর মধ্যেই প্রকৃতি আবার তার নিজস্ব ভাষায় চিঠি পাঠিয়েছে। আজ ভোরে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলের কাছে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে; সুনামি সতর্কতা জারি হয়েছে কয়েকটি অঞ্চলে। প্রাথমিকভাবে প্রাণহানির নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি, তবে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানুষকে উপকূল থেকে সরে যেতে বলা হয়েছে। প্রকৃতি মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যত বড় বড় পরিকল্পনাই করুক, পৃথিবীর নিজেরও কিছু পরিকল্পনা আছে।
আবহাওয়ার খবরটিও সুখকর নয়। এল নিনোর প্রভাবে ২০২৬ সাল অত্যন্ত উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। তবে বার্কলে আর্থের মে মাসের বিশ্লেষণে ২০২৬-কে রেকর্ড উষ্ণতম বছর হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ বলা হয়েছিল; বরং শক্তিশালী এল নিনোর কারণে ২০২৭ সালে নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনাই বেশি। অর্থাৎ পৃথিবী এবারও আমাদের সতর্ক করছে—তাপমাত্রার খবরকে কেবল আবহাওয়ার খবর ভাবলে চলবে না; এটি খাদ্য, পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও নগরজীবনের ভবিষ্যতের খবর।
আর হরমুজ? সেখানে পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো এখন এমন এক খেলায় নেমেছে, যার নিয়ম প্রতিদিন বদলাচ্ছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঠেকানো অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য, কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, তার চেয়েও আগে রয়েছে তেলের দাম কমানো। ইরানে হামলায় অংশ নেওয়া ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের জায়গায় ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েন করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন বলছে, আলোচনায় অচলাবস্থা কাটলে না উঠলে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ‘অনির্দিষ্টকাল’ চলতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করছেন হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে; ইরান পাল্টা বলছে, নিয়ন্ত্রণ ইরানেরই এবং নিষেধাজ্ঞা না উঠলে জলপথ খুলবে না। এর মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় ভয়াবহভাবে কমে গেছে এবং ১৪ আগস্ট ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮.৫২ ডলারে উঠেছে।
অবস্থা দৃষ্টে বলতে হয়—হরমুজ নিয়ে আমেরিকা আর ইরান দুজনেই বলছে, ‘চাবি আমার কাছে’; অথচ দরজাটি খুলছে না। সমস্যা হলো, দরজাটি তাদের ঘরের নয়—পৃথিবীর জ্বালানি সরবরাহের দরজা। ফলে তেলের দাম বাড়লে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হিসাব যেমন বদলায়, ঢাকার শিল্পকারখানার হিসাবও বদলায়। আমাদের গ্যাসের ঘাটতি আর হরমুজের সংকট তাই আলাদা খবর নয়; একই পৃথিবীর দুই প্রান্তের একই গল্প—জ্বালানি যখন অনিশ্চিত হয়, অর্থনীতি তখন হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খায়।
আজকের সম্পাদকীয় ভাবনাটি তাই খুব সরল। বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে নিশ্চয়তা তৈরি করা। রাজনীতিতে—প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের নিশ্চয়তা; শিল্পে—গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা; শিক্ষকের জীবনে—প্রাপ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা; আর রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদে—জ্বালানি ও জলবায়ু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। বড় বড় বক্তৃতায় রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। কারখানার মেশিন ঘুরলে, শিক্ষক তার পাওনা পেলে, ব্যবসায়ী আগামী মাসের গ্যাসের হিসাব জানলে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলা গেলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।
দিল্লির পাঁচতারা হোটেলের ঘর থেকে সীতাকুণ্ডের শিল্পাঞ্চল—দূরত্ব অনেক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্বের দূরত্ব একটুও নয়। প্রধানমন্ত্রী বিদেশে গিয়ে দেশের স্বার্থের কথা বলবেন; দেশে ফিরে সেই স্বার্থের বাস্তব অনুবাদ করতে হবে গ্যাসের পাইপে, বিদ্যুতের লাইনে, কারখানার চিমনিতে, শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে। তাহলেই সফর কূটনীতি হবে, সংবাদ নয়; আর সরকার প্রশাসন হবে, কেবল ক্ষমতা নয়।
শনিবারের সকাল তাই আমাদের কাছে একটু অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। বাইরে পৃথিবী উত্তপ্ত, সমুদ্র অশান্ত, বাজার অনিশ্চিত; অথচ মানুষের প্রত্যাশা খুব সাধারণ—বিদ্যুৎ চাই, গ্যাস চাই, কাজ চাই, ন্যায্য পাওনা চাই, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক চাই। রাষ্ট্রের অভিধানে এগুলো খুব বড় বড় শব্দ নয়। কিন্তু নাগরিকের জীবনে এর চেয়ে বড় শব্দও নেই।
আজকের দিনটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কূটনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে করা চুক্তি।
লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক