Dhaka Mail Logo

জাতীয়

শতকোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, অর্ণবের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০ পিএম

  • নেপথ্যে সম্পত্তির দ্বন্দ্ব বলছে পরিবার
  • হত্যার অভিযোগের তীর চাচাদের প্রতি
  • টেস্টের পর মাথায় কোনো সমস্যাও ধরা পড়েনি
  • পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে এটি আত্মহত্যা

বাবার মৃত্যুর পর তার শত কোটি টাকার সম্পত্তি ভোগ করছিল চাচারা। সেই সম্পত্তি বুঝে নেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাচাদের সঙ্গে মনোমালিন্য ও নানা ঝামেলা চলছিল ধানমন্ডির আল মুকাব্বির ইসলাম অর্ণবের (৩২)। কিছুতেই চাচারা তার সম্পত্তি ও জমির ভাগ বুঝে দিচ্ছেলেন না। ভাগ চাইতে গেলে নানাভাবে অপমান ও অপদস্ত করতেন তারা। এমনকি দখলকৃত সম্পত্তি যাতে হাতছাড়া না হয় তার জন্য চাচা তার মেয়ের সঙ্গে বিয়েরও চাপ দেন অর্ণবকে। এতেও রাজি না হলে তাকে সাইকো প্রমাণের জন্য ওঠেপড়ে লাগে তারা। হঠাৎ এক রাতে বাসার নিচে মিলে অর্ণবের লাশ। বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করতে থাকেন তারা চাচারা। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ অর্ণবের মা হালিমা খাতুনের।

তার দাবি, তার ছেলে কোনোভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে তার চাচারা হত্যা করেছেন। এই হত্যার নেপথ্যে শত কোটি টাকার সম্পদ।

চলতি বছরের ২ মে রাজধানীর ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১ তলা ভবনের নিচ থেকে অর্ণবের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ভবনটির লিফটের মেশিন কক্ষের ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানায় ধানমণ্ডি থানা পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হলেও পরে গত ২১ মে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন ঢাকার আদালতে আরেকটি মামলা করেন। সেই মামলায় তিনি অর্ণবের তিন চাচা-ফুপুসহ ১২ জনকে আসামি করেন।

মামলায় তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সেই মামলার আসামিরা হলেন- অর্ণবের চাচা ওসমান গণি ভূঞা (৬৮) ও তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়া (৭০), আরেক চাচা জাহেদ ভূঞা (৭২) ও তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম রেনু (৬২)। কিন্তু দুই মাসেও এই আলোচিত মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

শুক্রবার বিকেলে কথা হচ্ছিলো অর্নবের মা হালিমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, তারা আমার ছেলেটাকে স্থির থাকতে দিতো না। কখনো লোকজন দিয়ে আবার কখনো বাড়ির কাজের মেয়েদের দিয়ে নজরদারী করতো। তার বাবার শত কোটি টাকার সম্পত্তি তারা কিছুতেই বুঝে দিচ্ছিলো না। এসব নিয়ে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দেওয়া হয় তারা। তারা সুপরিকল্পিত তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক সাজায়। এই হত্যার নেপথ্যে তার চাচাদের পাশাপাশি ফুপুরাও রয়েছে বলে অভিযোগ অর্ণবের মায়ের।

তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর দুদিন আগেও অর্ণব তার খালা ও মাকে জানিয়েছে যে, তাকে মানসিক নির্যাতন করছেন তার চাচা। তার চাচা ওসমান গণি ও তার স্ত্রী অর্ণবের বাসায় এসেছিল। তারা তাকে বলেছিল তুমি অসুস্থ তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ছেলেটা আমার পুরোপুরি সুস্থ ছিল। সে যেতে না চাইলে তারা তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে অর্ণব কৌশলে সিগারেট কেনার নাম করে ঘরে থেকে বেরিয়ে খালা শাহনাজ বেগমের বাসায় চলে গিয়েছিল। পরে সেখানে তাদের সবকিছু খুলে বলে।’

নিহতের পরিবারের সদস্যদের দাবি, অর্ণবের মৃত্যুর পর ছেলে পৈতৃক শতকোটি টাকার সম্পদ বুঝে নেওয়ার কথা। কিন্তু ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুন তা দেয়নি। জমিজমা চাইতে গেলেই তারা বলতো জমি নিয়ে কি করবি? তোর বয়স হয়নি? তুই পরে আসিস নানান কথা। এসব নিয়ে তাদের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় অর্ণবের। তারা তাকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দিয়েছিল।

মৃত্যুর আগে অর্ণব তার মা ও খালাকে জানিয়েছিলেন, তার বাবার সম্পদ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করার পর থেকে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুন নানা ঝামেলা করছেন। তারা তাকে সম্পদের হিসাব বুঝিয়ে দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সম্পত্তি চাইতে গেলেই তারা তাকে গত দুই বছর ধরে হুমকি-ধামকি দিয়ে এবং অপমান করে আসছিলেন। সর্বশেষ তারই বাবার গড়া প্রতিষ্ঠান যাত্রাবাড়ীর রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অর্ণবকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তার চাচা ওসমান গণি ছোট মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।

মামলার এজাহারে যা উল্লেখ করা হয়েছে
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর থেকে তার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। মামলার আসামিরা এই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রি বা হস্তান্তরে বারবার বাধা দিয়ে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও নানাভাবে সীমিত করে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় তারা অর্ণবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এই ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়।

অর্ণবের বাবার শত কোটি টাকার সম্পদ
জানা গেছে, অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম পাসপোর্ট অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন। চাকরির সুবাদে তিনি রাজধানীর ধানমণ্ডির ৮/এ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট, সেগুনবাগিচায় কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট এবং মালিবাগের মীরবাগে ৫ তলা বাড়ি করেন। এ ছাড়াও যাত্রাবাড়ীতে রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিশোরগঞ্জের আকবপুরে ১০ একর জমির ওপর উমেদ আলী ভূঞা উচ্চ বিদ্যালয় এবং নীলগঞ্জে আড়াই একর জায়গায় রফিকুল ইসলাম কলেজ রয়েছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে কিশোরগঞ্জের খালিয়াজুড়িতে প্রায় একশ’ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি, তাড়াইল উপজেলায় ২০ একর জমি, দোতলা বাড়ি এবং কিশোরগঞ্জ শহরে ১০ শতাংশ জমি রয়েছে।

গৃহকর্মীদের দিকেও অভিযোগের তীর
অর্ণবের খালা শাহনাজ বেগম ঢাকা মেইলের প্রতিবেদককে বলেন, ‘তার চাচা ও ফুপুরা বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ভোগ করে আসছিল। ছেলেটা সেগুলো চাইতে গেলেও তারা বুঝিয়ে দেয়নি। উল্টো তাকে তারই বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের নিয়ে নজরদারী করতো। সে প্রায় বলতো খালা আমি বাসায় কফি ও চা খেলে কেন জানি মাথা ধরে যায়। প্রচণ্ড ঘুম আসে, মাথা ধরে। এমনকি পানি খেলেও এমন হতো। ফলে তার ও আমাদের ধারনা বাসায় থাকা দুই গৃহকর্মী জেস্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগম এসব কাজ করতো। তাদের মাধ্যমে ছোট চাচা ওসমান তাকে পাগল বানানোরও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অবশেষে তাকে সাইকো প্রমাণের চেষ্টায় নামে তারা। কিন্তু ছেলেটা মৃত্যুর আগের দিন ইবনে সিনা হাসপাতালে গিয়ে টেস্ট করে। সেই টেস্ট আমাকে দেখালে দেখি সব ভালো রিপোর্ট। পরদিন শুনি ছেলেটা মারা গেছে!’

এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে তার খালা বলেন, ‘মৃত্যুর দিন আমরা সেই বাসায় গিয়ে দেখি তার চাচা ও ফুপুদের চোখে মুখে কোনো পানি নেই। তারা কে কতটুকু জমি পাবে কে কোনটা ভোগ করবে এসব হিসাব করছে। এমনকি তার চাচা থানায় গেলেও খুব স্বাভাবিক ছিল।’

বিচার চান অর্ণবের মা
অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, ‘বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী জেস্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগম ও চাচা ওসমান গণিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। তার খাবারে স্লো পয়জন দেওয়া হতে পারে বা চেতনানাশক মিশ্রিত করে দেওয়া হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনায় প্রকৃত তদন্ত চাই।’

এ ঘটনায় মামলার তদন্তকারী ধানমন্ডি থানার এসআই আব্দুল করিম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’

এ বিষয়ে ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা যে ফুটেজ পেয়েছি তাতে দেখছি সে একাই সেখানে ছিল। ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার সময় পাশে কেউ ছিল না। আর তার বাবার সম্পত্তি নিয়ে যে চাচাদের সঙ্গে বিরোধ ছিল তা আমরা তদন্তে পেয়েছি। তবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা এখনো বলা সম্ভব নয়। তদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে বলা যাবে।’

এমআইকে/এমআই