ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতির কারণে সংকট তৈরি হয়েছে গ্যাসনির্ভর প্রতিটি সেক্টরে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে লোডশেডিং বেড়েছে। অনেক শিল্প কারখানায়ও উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকার পূর্ব রামপুরার একই বাড়িতে ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন হাজেরা খাতুন। তবে রান্নার জন্য গ্যাসের চুলা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার অভিজ্ঞতা তার এবারই প্রথম।
হাজেরা বলেন, ‘অতীতেও গ্যাস সংকটের ভেতর দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে, কিন্তু এত তীব্র সংকটের মুখোমুখী হতে হয়নি। ১৩-১৪দিন একবারেই আসে নাই। ১০ বছর হয় হাজিপাড়া আসছি। এই দুই মাসে সমস্যা একবারে বেশি। আগে সকালে (গ্যাস) যাইতো, আবার দুইটা-আড়াইটার পর আসতো। আবার সন্ধ্যা ছয়টার পরে যাইতো। এখন মোটেই নাই।’

পাইপলাইনে গ্যাসের সংকটে তার প্রতিবেশীরা কেউ কেউ মাটির চুলাও ব্যবহার করছেন। যাদের সামর্থ্য আছে এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন।
শিল্প কারখানার মালিকদের দাবি, গ্যাস সংকটের এই পরিস্থিতি 'আতঙ্কের'। শিল্প কারখানায় নতুন সংযোগ বন্ধ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর জ্বালানি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রাজীব হায়দার বলেন, ‘গ্যাসের সংকটটা এখন খুবই ভয়াবহ এবং এটা একটা আতঙ্ককর পরিস্থিতি। আগে যেটা ছিল সেটা ম্যানেজ করা যেত। এখন যেটা আসছে এটা আমাদের ম্যানেজ করার আয়ত্বের বাইরে।’
রাজীব হায়দারের দাবি, বাংলাদেশে বিটিএমএর সমন্বিতভাবে প্রায় ২৩ বিলিয়ন (দুই হাজার ৩০০ কোটি) ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। রপ্তানিমুখী কারখানার সুতা, কাপড়, ডেনিম ফেব্রিক সরবরাহে এই কারাখানগুলো কাজ করে।
তিনি বলেন,‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলো ২৪ ঘণ্টা অপারেশনে থাকে। গ্যাস সংকটে আমাদের যেকোনো একজন ভালো উদ্যোক্তাও, যিনি সবসময় ভালোমতো ব্যবসা করেছেন, ব্যাংকের দায় দেনা শোধ করেছেন, উনি যদি হঠাৎ করে এরকম একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তাহলে কিন্তু উনি খেলাপি হয়ে যেতে পারেন। কারণ জ্বালানিটা যদি ঠিক না থাকে তাহলে কীভাবে প্রোডাকশন করবেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘আর আপনি যদি প্রোডাকশন না করতে পারেন তাহলে ব্যাংকের দায়দেনা বা পণ্যের কাচামালের খরচ কীভাবে দেবেন, তো এটা একটা বিগ ফ্যাক্টর। বর্তমানে এটা আমাদের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ।
এত গ্যাস সংকট কেন
বাংলাদেশ গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ উৎপাদন ও আমদানিতে সংকট। তবে চলমান গ্যাস সংকটের পেছনে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনাও দায়ী।
বর্তমনে বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেড় হাজার মিলিয়ন ঘটফুট (এমএমসিএফডি) উত্তোলন করা সম্ভব হয়, আর আমদানি হয় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

পেট্রোবাংলার ১১-১২ অগাস্টের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশি-বিদেশি কোম্পানি মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছে ১৬শ এমএমসিএফডির কিছু বেশি। আর আমদানি হয়েছে ৪৬৭ এমএমসিএফডি।
একটি এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে দৈনিক প্রায় ৫শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সংকট তীব্র লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সম্প্রতি একদিনে লোডশেডিং সর্বোচ্চ তিন হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
গ্যাস সংকট মেটাতে বাংলাদেশে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করা শুরু হয়। বেসরকারিভাবে সাগরে ভাসমান দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) স্থাপন করে গ্যাস আমদানি হয় যার সক্ষমতা দৈনিক ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট।
কিন্তু এই এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ মাত্রায় আমদানি করলেও বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না। নতুন শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ পাচ্ছে না। সার কারখান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাহিদামত গ্যাস কখনোই সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন গ্যাস সংকটের পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হচ্ছে। অধ্যাপক ম তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশে গ্যাসের উৎপাদন প্রায় ১৫শ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে যেটা ২০১৬-১৭ সালে ১৯ মিলিয়নের মতো ছিল। এটা দিনে দিনে কমে আসছে।’
গ্যাসের এই সংকট মোকাবিলায় পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স গত ৫/৭ বা ১০ বছরে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যতগুলো উদ্যোগ নিয়েছে তাতে উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে দেখা গেছে যে নেট উৎপাদন কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটকে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার শেষ পর্যন্ত বিশেষ বিধান আইনে নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে সমালোচনা আছে, সাগরে ও স্থলভাগে ব্যাপক গ্যাস অনুসন্ধান হয়নি, যে কারণে আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে।
নতুন সরকার সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করেছে। কিন্তু এখানে নতুন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলে এবং অনুসন্ধান করে গ্যাস আবিষ্কার হলে সেটি পেতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।
অধ্যাপক ম তামিম বলেন, ‘নতুন অনুসন্ধান হচ্ছে না। অফশোরে আমরা দিয়েছি, এটাও আসতে আসতে ৫/৭ বছর লাগবে। যদি খনন করে আবিষ্কার হয়, সেটা হলেও তিন চার বছর লাগবে এটাকে নিয়ে আসতে। ফলে আমাদের আমদানি থেকে আমাদের মুক্তি নাই।’
এক সময় মুখে মুখে বলা হতো, বাংলাদেশ গ্যাসের উপর ভাসছে। গ্যাস রপ্তানি নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। অথচ উৎপাদন ও মজুত কমতে থাকায় ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এলএনজি আকারে গ্যাস আমদানি শুরু করে।
একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, অন্যদিকে আমদানি সক্ষমতা না থাকায় গ্যাস সংকট খুব দ্রুত সমাধান হবে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক ম তামিমের পরামর্শ, স্বল্প মেয়াদে গ্যাসক্ষেত্রে উপরের স্তরে অনুসন্ধান করে গ্যাস উত্তোলন করা যায়। ভোলার গ্যাস কীভাবে নিয়ে আসা যায় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। একইসঙ্গে, আরো বিদ্যুৎ আমদানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কয়লা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
জ্বালানি খাতে পরিস্থিতি উন্নতির জন্য প্রয়োজনে স্থলভাগেও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে গ্যাস অনুসন্ধান করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন, যেটা ১৯৯৭ সালের পরেআর হয়নি।
অধ্যাপক ম তামিম আরও বলেন,‘আমাদের সমান্তরালভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে। সেই কাজে অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে একটা বড় ধরনের মনোযোগ দিতে হবে।’
জ্বালানি বিভাগ কী বলছে
সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বর্তমান সরকার জ্বালানি সংকট সমাধানের চেষ্টা করবে।
সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন করে দেড়শ কূপ খননেরও উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি বলেছেন, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য এ সরকার দায়ী করা যাবে না। আমাদের সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস এবং আমাদেরকে এইসব জিনিস ইনহেরিট করতে হয়েছে। এখন যেটা আছে এটাও আমরা আশা করি সাকসেসফুলি ওভারকাম করতে পারবো।’
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘দেশীয় উৎপাদন ঘাটতি কারণে গ্যাস আমদানি করতে হবে। আমদানি অবকাঠামো হিসেবে স্থলভাগে এবং সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করতে উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।’
তিনি বলেন, ‘দেশীয় উৎপাদন এবং আমাদানি দুটি মিলেও গ্যাসের যে চাহিদা আছে প্রায় ১২শ এমএমসিএফ পার ডে, আমাদের গ্যাপ রয়ে গেছে। আপনার কাছে যদি টাকাও থাকে তাও আপনি রাতারাতি এলএনজি ইমপোর্ট বাড়াতে পারবেন না। কারণ আমাদের সে অবকাঠামো নেই।’
বাংলাদেশে স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল নেই। সাগরে ভাসমান টার্মিনাল দুটি। সরকার এরই মধ্যে চীনের একটি কোম্পানিকে দিয়ে এফএসআরইউ স্থাপনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এটার বাস্তবায়নেও সময় লাগবে।
বাংলাদেশে গ্যাস উৎপাদন কমে আসায় ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এর জন্য সমুদ্রে দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এর একটি সামিটের, অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির।
এছাড়া গ্যাস আমদানি বাড়াতে ২০২৪ সালে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনে সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। ২০২৭ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্যে সামিট গ্রুপের সঙ্গে যে এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ওই চুক্তি বাতিল করে দেয়।
তৃতীয় এফএসআরইউ বাতিল করার কারণে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত প্রস্তুতির দিক থেকে ২/৩ বছর পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক ম তামিম বলেন, ‘আমি মনে করি ঢালাওভাবে বাতিল করা ঠিক হয়নি। স্পেশালি এফএসআরইউ।... বাতিল করার আগে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে বিকল্প ব্যবস্থা আমি কত দ্রুত আনতে পারবো। এফএসআরইউ মার্কেট ভেরি টাইট মার্কেট।’
চীনের সঙ্গে জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে দুই বছরের মধ্যে নতুন এফএসআরই স্থাপনের কথা বলছে জ্বালানি বিভাগ। এ ব্যাপারে অধ্যাপক ম তামিম বলেন, ‘চীনের আসলে এফএসআরইউ তৈরি করার অভিজ্ঞতা খুব বেশি দিনের না। তাদের একটা কোম্পানি বড় এফএসআরইউ ক্যারিয়ার বানিয়েছে, আরেকটা কনভার্সন করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চীনের কোম্পানিগুলো এফএসআরইউ ব্যবসায় নতুন। যদি তাদের হাতে জাহাজ থেকে থাকে, কোনো ক্যারিয়ার থেকে থাকে যেটা কনভার্সন করবে, তাহলে হয়তো আঠারো মাসে হয়তো তারা যেটা বলেছে দিতে পারবে। কিন্তু সেটা না থাকলে আঠারো মাসে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেও কাজ শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি চালু হতেও দীর্ঘ সময় লাগবে।
অধ্যাপক তামিম বলেন এটা অনেক আগে পরিকল্পনা ছিল কাজগুলো হাতে আগে নিলে হয়তো এখন হয়ে যেত।
সবমিলিয়ে জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা এবং বিশেষজ্ঞদের কথায় বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান নেই। তবে দুর্ঘটনাকবলিত এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ হলে চলমান তীব্র সংকট কিছুটা কমবে এবং সেটা সরকারও বার বার বলছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এমআই