মাহফুজুর রহমান
১২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র কারওয়ান বাজার। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণা, যানজট, ব্যবসা-বাণিজ্য আর ব্যস্ততার মধ্যেও এখানে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে মুঘল আমলের এক অনন্য নিদর্শন আম্বর শাহ শাহী জামে মসজিদ। চারপাশের আধুনিক বহুতল ভবন ও কংক্রিটের নগরায়ণের মাঝেও প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে এই মসজিদ।
আজও বহু মানুষ প্রতিদিন মসজিদটির সামনে দিয়ে যাতায়াত করলেও এর প্রকৃত ইতিহাস, স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য কিংবা প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। অথচ এটি ঢাকার মুঘল নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্য ও ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল।
অবস্থান
আম্বর শাহ শাহী জামে মসজিদ রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব পাশে অবস্থিত। মসজিদটি একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত। একসময় এই সড়কটি ছিল মুঘলদের নির্মিত ট্রাঙ্ক রোড, যা দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক যাতায়াত হতো।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
মসজিদটি ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন খাজা আম্বর। তিনি মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খানের প্রধান খোজা ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন।
মসজিদের প্রবেশপথে সংরক্ষিত একটি শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে, খাজা আম্বর একইসঙ্গে একটি মসজিদ, একটি কূপ এবং একটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন। সে সময় কারওয়ান বাজার ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন। তাদের সুবিধার্থেই এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল।
‘আম্বর শাহ’ নামের উৎপত্তি
বর্তমানে মানুষ মসজিদটিকে ‘আম্বর শাহ মসজিদ’ নামে চেনে। তবে ঐতিহাসিক নথিতে এর প্রতিষ্ঠাতার নাম খাজা আম্বর। সময়ের প্রবাহে স্থানীয়ভাবে তিনি ‘আম্বর শাহ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং সেই নামেই মসজিদটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।
মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন
মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর বাইরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩.৪১ মিটার এবং প্রস্থ ৬.৭১ মিটার। চার কোণায় রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির মিনারসদৃশ টাওয়ার। এগুলোর মাথায় ছোট গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। মাঝের গম্বুজটি পাশের দুটি গম্বুজের তুলনায় বড়। মসজিদের পূর্ব পাশে তিনটি প্রবেশদ্বার এবং উত্তর ও দক্ষিণ পাশে একটি করে দরজা রয়েছে। ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব নির্মিত হয়েছে। মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং বাইরে সামান্য উঁচু হয়ে বেরিয়ে এসেছে। মসজিদের ভেতরের মিম্বরও পাথরের তৈরি।
কালো ব্যাসল্ট পাথরের ব্যবহার
মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর দরজা, মিহরাব এবং মিম্বারে কালো ব্যাসল্ট পাথরের ব্যবহার। মুঘল আমলের বাংলার মসজিদে এত ব্যাপকভাবে কালো ব্যাসল্ট ব্যবহারের উদাহরণ খুব বেশি দেখা যায় না। গবেষকদের ধারণা, এই পাথর বর্তমান ভারতের রাজমহল পাহাড় অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল।
উঁচু প্ল্যাটফর্ম
মসজিদটি প্রায় ১২ ফুট উঁচু একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত। তাই উঁচু ভিত্তির ওপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেই মূল নামাজঘরে প্রবেশ করতে হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, তখন আশপাশের এলাকা নিচু ও জলাবদ্ধ ছিল।
খাজা আম্বরের সমাধি
মসজিদের উত্তর পাশে রয়েছে খাজা আম্বরের সমাধি। প্রথমদিকে এটি ছিল একটি সাধারণ কবর। পরে এর ওপর ইটের কাঠামো নির্মাণ করা হয়। মসজিদ ও সমাধি একসঙ্গে একটি ঐতিহাসিক কমপ্লেক্স গঠন করেছে।
হারিয়ে যাওয়া কূপ
মসজিদের পূর্ব সিঁড়ির পাশে খাজা আম্বরের খনন করা একটি কূপ ছিল। বর্তমানে সেটি মাটি দিয়ে ভরাট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একসময় এই কূপ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের পানির প্রধান উৎস ছিল।
সংস্কার ও পরিবর্তন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মসজিদটি একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। তখন পূর্ব পাশে তিন গম্বুজবিশিষ্ট বারান্দা যুক্ত হয়। ১৯৮০-এর দশকে পূর্ব দিকে বহুতল সম্প্রসারণ করা হয়, ফলে মসজিদটির মূল মুঘল রূপ অনেকটাই আড়াল হয়ে যায়। সিমেন্ট প্লাস্টার করার কারণে মূল অলংকরণের অনেকাংশও হারিয়ে গেছে।
কী কী হারিয়ে গেছে
ঐতিহাসিকদের মতে, মূল দেয়ালের অলংকরণ, টেরাকোটা ও নকশার অনেক অংশ, প্রাচীন কূপ ও আশপাশের উন্মুক্ত পরিবেশ সবই আধুনিক সংস্কার ও নগরায়ণের কারণে বিলুপ্ত বা আড়াল হয়ে গেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়। এটি প্রমাণ করে, ১৭শ শতকে কারওয়ান বাজার ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। একইসঙ্গে এটি মুঘলদের নগর পরিকল্পনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনকল্যাণমূলক স্থাপত্যেরও সাক্ষ্য বহন করে। খাজা আম্বর শুধু মসজিদই নির্মাণ করেননি; তিনি সেতু ও কূপও নির্মাণ করেছিলেন, যা সে সময়ের অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ ছিল।
বর্তমান চিত্র
আজ চারদিকে বহুতল ভবন, অফিস, বাজার ও যানজটের ভিড়ে মসজিদটি অনেকটাই আড়ালে। তবুও প্রতিদিন শত শত মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও সাধারণ পর্যটকদের কাছে এটি এখনো তুলনামূলক কম পরিচিত। নগরায়ণের চাপের মধ্যেও মসজিদটি তার মুঘল ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।
সংরক্ষণের প্রয়োজন
ঐতিহাসিক স্থাপনাটি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন মূল মুঘল স্থাপত্য সংরক্ষণ, অবশিষ্ট শিলালিপি ও পাথরের অলংকরণ রক্ষা, আশপাশে পরিকল্পিত পরিবেশ নিশ্চিত করা, দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যফলক স্থাপন ও গবেষণা ও পর্যটন উদ্যোগ বৃদ্ধি।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরান ঢাকার যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকই অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা মানেই শুধু নতুন নতুন বহুতল ভবন নয়। এই শহরের চারশ বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যই ঢাকার প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই ইতিহাসের খুব সামান্য অংশই আমরা সংরক্ষণ করতে পেরেছি। হাতে গোনা কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো টিকে আছে। এগুলোকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাবে।’
চাকরিজীবী রাজীব মাহবুব বলেন, ‘আম্বর শাহ শাহী জামে মসজিদ মুঘল আমলে ঢাকার নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্যশৈলী ও জনকল্যাণমূলক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আধুনিক নগরায়ণের চাপে এর মূল বৈশিষ্ট্য অনেকটাই আড়াল হয়ে গেলেও অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘মসজিদটির কালো ব্যাসল্ট পাথরের ব্যবহার, তিন গম্বুজের নকশা এবং উঁচু প্ল্যাটফর্মে নির্মাণ এসবই মুঘল স্থাপত্যের স্বাতন্ত্র্য বহন করে। ভবিষ্যতে কোনো সংস্কারকাজ হলে মূল স্থাপত্যরীতি অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।’
আম্বর শাহ শাহী জামে মসজিদ শুধু একটি প্রাচীন মসজিদ নয়; এটি ঢাকার মুঘল অতীতের জীবন্ত স্মারক। কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও এই স্থাপনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, আধুনিক ঢাকার বুকে এখনো লুকিয়ে আছে শত শত বছরের ইতিহাস।
যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এম/এএইচ