Dhaka Mail Logo

জাতীয়

এসডিজিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ, তিন গ্রামকে ‘পাইলটিং ভিলেজ’ বানাচ্ছে সরকার

আব্দুল হাকিম

১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

  • নির্বাচিত গ্রাম: মিতিঙ্গাছড়ি, পানখালী ও নাফানগর
  • জাতীয় ৩৯টি অগ্রাধিকার সূচকের সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় উন্নয়ন
  • স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় এসডিজি বাস্তবায়নই মূল লক্ষ্য-জিইডি
  • এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থায়ন ঘাটতি ৪২১ বিলিয়ন ডলার
  • সফল হলে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে মডেলটি
  • তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরাপদ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও যোগাযোগ সমস্যার মতো নানা সংকটে থাকা দেশের তিন গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দিনাজপুরের নাফানগর, খুলনার পানখালী ও রাঙামাটির মিতিঙ্গাছড়িকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বেছে নিয়ে স্থানীয় তিন ধরনের ঝুঁকি ও সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনটি গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও জলবায়ু ঝুঁকির ধরন আলাদা। ফলে প্রতিটি গ্রামের জন্য স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় পৃথক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বলছে, এসডিজির মূল মন্ত্র হলো কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা। এসডিজির ১৭টি অভীষ্ট, ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা ও ২৫০টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, সব দেশের জন্য সব সূচক সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। এসডিজির অভীষ্টগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বৈশ্বিক অভীষ্টের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বয় এসডিজি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে কোনোটি পুরোপুরি লক্ষ্যের পথে নেই। ১০টির অগ্রগতি থেমে আছে, একটির অবনতি হচ্ছে এবং ছয়টিতে কিছু অগ্রগতি হচ্ছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিলোপ, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, গুণগত শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং অসমতা হ্রাসের মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তিন গ্রামের তিন ধরনের সংকট

এসডিজি ভিলেজ হিসেবে বাছাই করা নাফানগর গ্রামটি দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে প্রায় ৪ হাজার ৩৯৭ মানুষের বসবাস। গ্রামটির প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং ৩৫ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ু ঝুঁকি রয়েছে সেখানে। দারিদ্র্যের হার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্ব প্রায় ৭০ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে পানীয় জলের তীব্র সংকটও রয়েছে।

নাফানগরের সম্ভাবনার জায়গায় কাঁকড়া চাষকে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ঝপঝপিয়া নদী ও খালগুলো ব্যবহার করে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদারের সুযোগও রয়েছে।

নাফানগরের জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থানের অনুপাত ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং নদী-নালা, খাল-বিলে পরিচালিত দূষণবিরোধী অভিযানের সংখ্যা দ্বিগুণ করা। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও পয়ঃব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামটি সুন্দরবন-সংলগ্ন অনগ্রসর উপকূলীয় এলাকা। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা এখানকার বড় সমস্যা। সিডর, আইলা ও আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামটির অবকাঠামো ও মৎস্যঘের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানীয় জলের তীব্র সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষিত যুবক বেকার এবং মৌসুমি বেকারত্বও রয়েছে।

পানখালীর সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে কাঁকড়া চাষ, নদী ও খালকে কাজে লাগিয়ে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। গ্রামটিতে কাঁকড়া চাষ ও নির্মাণকাজে নারী-পুরুষ সমান মজুরি পাওয়ার বিষয়টিকেও ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পানখালীর জন্য নিরাপদ খাবার পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধাভোগী সংখ্যা শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাবার পানি ব্যবহারকারী জনসংখ্যার হার শতভাগে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রামটির পাইলট কার্যক্রমে পানি ও স্যানিটেশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি একটি পাহাড়ি জনপদ। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বনজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। কৃষি, জুমচাষ, পশুপালন, মৎস্যচাষ, হস্তশিল্প ও বনজ সম্পদভিত্তিক কাজ এখানকার মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

তবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর চরম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাহাড়ি ভূমিধস, অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও রয়েছে। ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সুবিধা ব্যাহত হয়। জরুরি সময়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসংক্রান্ত যোগাযোগের ঘাটতিও রয়েছে।

মিতিঙ্গাছড়িতে বাঁশ-বেতভিত্তিক কুটিরশিল্প ও বনজ সম্পদভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর্ণফুলী নদী, কাপ্তাই হ্রদ ও পাহাড়ি পরিবেশকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই গ্রামের জন্য ২০২৮ সালের আগে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে এনে পরপর তিন বছর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাপ্তাই উপজেলায় বেকারত্বের হার ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে এসডিজি

পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন গ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা একই ধরনের হবে না। যে গ্রামের যে সমস্যা, সেই অনুযায়ী এসডিজির অভীষ্ট ও জাতীয় অগ্রাধিকার সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে।

মিতিঙ্গাছড়ির ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দুর্গমতা, যোগাযোগ সংকট, অপ্রতুল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সমাধানে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, পার্বত্য এলাকায় বিশেষ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নের মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

নাফানগরের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য, পুরুষদের কর্মবিমুখতা, মৌসুমি বেকারত্ব, সুপেয় পানির অভাব, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা বলয়, কারিগরি শিক্ষা, শ্রম বৈষম্য দূরীকরণ ও বাল্যবিবাহ রোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আর পানখালীর ক্ষেত্রে নদীভাঙন ও লবণাক্ততা, জলবায়ু ঝুঁকি, সুপেয় পানি ও সেচ ব্যবস্থার সংকট এবং শিক্ষিত ও মৌসুমি বেকারত্বকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর জন্য খাল খনন, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ, নদী শাসন ও পুনর্বাসন এবং লবণাক্ততা সহিষ্ণু কৃষি গবেষণার মতো কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে।

পানি, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে জোর

এসডিজি ভিলেজ পাইলটিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের ৩৯টি অগ্রাধিকার সূচকের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের সংযোগ ঘটানো হবে। এর মধ্যে দারিদ্র্য কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য, গুণগত শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও জলবায়ু মোকাবিলার মতো বিষয় রয়েছে।

জাতীয় অগ্রাধিকার সূচকে নিরাপদ খাবার পানি সুবিধাভোগী জনসংখ্যা শতভাগে উন্নীত করা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। একইভাবে বেকারত্বের হার কমানো এবং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মে নিয়োজিত নয় এমন যুব জনগোষ্ঠীর হার কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

এসডিজি ভিলেজের সঙ্গে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, স্থানীয় পণ্য ও সরবরাহব্যবস্থার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচিত গ্রামগুলোতে নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, চরাঞ্চলের মানুষের বিচ্ছিন্নতা, বাল্যবিবাহের উচ্চ হার, জন্মগত প্রতিবন্ধিতার আধিক্য এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবায় পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব রয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আরেকটি গ্রাম নির্বাচন করা হয়েছে। সেখানে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং কৃষিজমির অবক্ষয়ের কারণে মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য, মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া এবং পর্যাপ্ত সামাজিক সেবার অভাব রয়েছে।

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প সমন্বয়ক মো. মঞ্জুরুল হক জানান, মিতিঙ্গাছড়ির স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মিতিঙ্গাছড়িকে একটি আদর্শ ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরবর্তী সময়ে এই গ্রামের অভিজ্ঞতা ও সফলতাকে সারাদেশের অন্যান্য গ্রামের জন্য টেকসই উন্নয়নের একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে কাজে লাগানো হবে।

জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় নিয়ে তিনটি গ্রাম নির্বাচন করা হয়েছে। দেশে ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রাম রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি গ্রামকে মডেল গ্রামে রূপান্তর করা হবে। এসব গ্রামের উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এসডিজি লক্ষ্যের সঙ্গে সেগুলোকে সমন্বয় করা হয়েছে। এখন বাস্তবায়ন শুরু হবে।

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ বলেন, তিনটি গ্রামকে মডেল হিসেবে নিয়ে সেখানে এসডিজির লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব গ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাবে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর। সফল হলে পরবর্তী সময়ে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। পুরো জাতিকে নিয়ে পরীক্ষা করা যায় না। তিনটি বা চারটি গ্রামে কাজ করে যদি দেখা যায় যে এটি ভালোভাবে কাজ করছে, তাহলে সেটিকে সারা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এসব গ্রাম হবে পরীক্ষাগারের মতো।

তিনি বলেন, বিএনপি এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিষয়গুলো নিয়েছে, আসলে তা নয়। প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, এমডিজি, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত ছিলাম। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির সময় এসডিজিকে সামনে রাখা হয়নি। বরং জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন দফা ও নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। পরে দেখা গেছে, এসব বিষয়ের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থায়নের ঘাটতি। দেশের এসডিজি অর্থায়ন ঘাটতি ৪২১ বিলিয়ন ডলার। এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ঘাটতি সামনে রেখেই বাংলাদেশকে এসডিজি অর্জনের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এসডিজি অর্জনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল ও নদী খনন, বৃক্ষরোপণ, ই-হেলথ, ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’, নারীদের শিক্ষার বিস্তার এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের সঙ্গে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্য সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে প্রত্যেকটি পরিকল্পনা ও প্রকল্পকে পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলগত কাঠামো এবং নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে একটি কর্মসূচির আওতায় একগুচ্ছ প্রকল্পকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি পাঁচ বছর শেষে এসডিজি বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি হয়েছে, তারও স্পষ্ট মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

এদিকে গত সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে  দেশের প্রথম তিনটি ‘এসডিজি ভিলেজ’ পাইলট কর্মসূচিরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসময় তিনি বলেন, দেশ পুনর্গঠন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য সামনে রেখে এসডিজি বাস্তবায়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। দীর্ঘ সময়ের শাসন ও অব্যবস্থাপনায় ঋণ ও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়া ভঙ্গুর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এখন সময় এসেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ সব ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে এসডিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্য দেখিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সবাইকে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান জানান, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি, পর্যটন ও স্থানীয় পণ্যের বাজারজাতকরণ করতে হবে। পাশাপাশি জুমচাষিদের কৃষক কার্ডের আওতায় এনে তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারজাত নিশ্চিত করা দরকার।

দিনাজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. সাদিক রিয়াজ বলেন, বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগরকে এসডিজি গ্রামের পাইলট কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে দারিদ্র্য কমাতে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। দিনাজপুরের লিচু প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানির জন্য গবেষণাগার স্থাপন এবং বেকার যুবকদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সঙ্গে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং বিরল স্থলবন্দর চালু করে সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নের ওপর জোর দেন।

এএইচ/এএস