নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
আধিপত্য বিস্তারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের মানুষের মন-মানসিকতার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ওই রাষ্ট্রের সম্পদ, প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোর ওপরও সহজে প্রভাব বিস্তার করা যায়।’
সোমবার (১০ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজ আয়োজিত ‘নতুন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কৌশল’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে একটি জাতির মানুষের চিন্তা ও মননে অন্য রাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা হয়।’ ব্রিটিশ শাসনামলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সে সময় এ দেশের একটি শ্রেণি ব্রিটিশদের অনুকরণ করত। তাদের পোশাক, উচ্চারণ, জীবনযাপন ও আচরণে ব্রিটিশদের প্রভাব ছিল প্রবল। তারা নিজেদের ভারতীয় হিসেবে নয়, বরং ব্রিটিশ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল।
তিনি বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে অশিস নন্দীর ‘দ্য ইন্টিমেট এনিমি’ বইটির কথা উল্লেখ করা যায়। শত্রুকে শুধু বাইরে থেকে মোকাবিলা করাই আধিপত্যবাদের একমাত্র রূপ নয়; বরং যখন শত্রুকে নিজের মনন ও মস্তিষ্কের মধ্যে ধারণ করা হয়, তখন সেটিই সবচেয়ে গভীর আধিপত্যবাদে পরিণত হয়।’
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘একটি দেশের জনগণের চিন্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে সেই দেশের মাটির নিচে ও ওপরে থাকা সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। তখন ওই দেশের কিছু মানুষ নিজেদের দেশের স্বার্থের পরিবর্তে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি সমাজের ভেতরে বিভাজন তৈরি করা আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম কার্যকর কৌশল।’
চাণক্যনীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সব সময় বন্ধু হিসেবে বিবেচনা না করে তাকে অস্থিতিশীল রাখার কৌশলের কথা সেখানে বলা হয়েছে। আর কোনো দেশকে অস্থিতিশীল রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সেই দেশের সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করা।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই সমাজে বিভাজন তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন চলে আসছে। অন্য অনেক দেশের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশে সেই বিভাজন এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকেরা একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, সিভিল সোসাইটি, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছে। এর ফলে একটি জাতির অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে একটি সমজাতীয় জাতি হিসেবে উল্লেখ করে দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ভাষাগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য কম। অথচ এই সমজাতীয় সমাজকেও এমনভাবে বিভক্ত করা হয়েছে যে মানুষ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।’ এ অবস্থাকে তিনি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গভীর সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বিভাজন তৈরি হলে তার প্রভাব জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও পড়ে।’ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামো নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, পাঁচজন ‘সিটিং জেনারেল’ অন্য দেশে চলে গেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনা নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য, সামরিক পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।
তিনি বলেন, ‘যে বিভাজন দূর করার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই বিভাজন যদি আবারও সমাজে ফিরে আসে, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি পর্যায়ে রাষ্ট্র এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে সমাজের বিভিন্ন অংশ একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের অনুসারীদের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটির বিভিন্ন অংশেও এই বিভাজন বিস্তৃত হয়েছিল।’
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল আধিপত্যবাদের অবসান, রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং নতুনভাবে জাতি গঠন। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা জরুরি।’
তবে জুলাইয়ের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গঠিত সরকারের মধ্যে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সরকারের একটি অংশ জুলাইয়ের ঘটনাকে স্বীকার বা ধারণ করতে অনাগ্রহী। ফলে জুলাইয়ের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জায়গায় নিজেদের আত্মপরিচয় ও জাতীয় স্বার্থকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’
এম/এআর