মো. মেহেদী হাসান হাসিব
১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪১ এএম
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারে নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বড় একটি ঘাটতি রয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে থাকা প্রায় ১৩ কোটি নাগরিকের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি নাগরিকের আইরিশের প্রতিচ্ছবি ও ১০ আঙুলের ছাপ নেই। ফলে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যেমন তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা, তেমনি জালিয়াতি ও পরিচয় গোপনের সুযোগও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বায়োমেট্রিক তথ্য অসম্পূর্ণ থাকায় ব্যাংকিং, সিম নিবন্ধন, সরকারি সেবা গ্রহণসহ পরিচয় যাচাই প্রয়োজন এমন বিভিন্ন কাজে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক নাগরিক।
ইসি সূত্র বলছে, নির্দিষ্ট মান পূরণ না করলে কোনো ব্যক্তির আঙুলের ছাপ কমিশনের সার্ভারে সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে যাদের আঙুলের ছাপ অস্পষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ, তাদের ক্ষেত্রে পুরো বায়োমেট্রিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এতে একদিকে জাতীয় পরিচয় ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে নাগরিকদের তথ্য হালনাগাদ ও পূর্ণাঙ্গ করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
সূত্রের দাবি, এর ফলে একদিকে নাগরিকরা বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে প্রতারকদের সহায়তা নিয়ে অন্য ব্যক্তির আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

১০ আঙুলের ছাপ না থাকা নাগরিকরা কী ধরনের ভোগান্তিতে পড়ছেন— জানতে চাইলে ইসি কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এ কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। বর্তমানে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল সিম থাকা বাধ্যতামূলক। ফলে নতুন সিম কিনতে গেলে ১০ আঙুলের ছাপ না থাকায় অনেক নাগরিক সিম নিবন্ধন করতে পারছেন না। এটিই বর্তমানে এ ধরনের নাগরিকদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি।
সূত্র আরও জানায়, এছাড়া পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোবাইল সিম নিবন্ধন, আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়াসহ বিভিন্ন সেবা পেতেও সমস্যা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে পরে তারা নির্বাচন কমিশনের শরণাপন্ন হচ্ছেন। যাদের আঙুলের ছাপ নেওয়া সম্ভব, তাদের ছাপ সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। আর যাদের আঙুলের ছাপ নেওয়া সম্ভব হয় না, তাদের প্রত্যয়ন দেওয়া হচ্ছে। ওই প্রত্যয়ন দেখিয়ে তারা মোবাইল সিমসহ অন্যান্য সেবা নিতে পারছেন।
সূত্রের দাবি, প্রতারকরা অর্থের বিনিময়ে অন্য নাগরিকের পায়ের আঙুলের ছাপ কিংবা হাতের অন্য আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছেন। যেসব রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, তাদের আটক করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে যাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তারা ভোটার তালিকায় থেকেই যাচ্ছেন।
সূত্রটি আরও জানায়, ভোটার তালিকায় একজন রোহিঙ্গা কিংবা বিদেশি নাগরিক থাকলেও তা ভোটার তালিকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় রোহিঙ্গা শনাক্তে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) রোহিঙ্গা ডাটাবেজ ব্যবহারের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ডাটাবেজটি পাওয়া গেলে এ ঝুঁকি আর থাকবে না বলে মনে করছে ইসি।

কী বলছে নির্বাচন কমিশন
প্রায় ৬ কোটি নাগরিকের আইরিশ ও ১০ আঙুলের ছাপ এখনো ডাটাবেজে আপলোড হয়নি— এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এটা যুক্তিসংগত কোনো কারণই নেই। এটা ঠিক না। আমার মনে হয়, তথ্যগত কোনো জায়গায় ভুল থাকতে পারে।’ বিষয়টি তিনি আরও যাচাই করে দেখবেন বলেও জানান।
ইসি সচিব আরও বলেন, দেশে ভোটার নিবন্ধনের সময় আবেদনকারীর তথ্য ও বায়োমেট্রিক সংগ্রহ করে তা সিস্টেমে যাচাই করা হয়। এরপর ডুপ্লিকেশন বা অন্য কোনো তথ্যের সঙ্গে মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়।
আখতার আহমেদ বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে তদন্তের প্রয়োজন হওয়ায় কিছুটা সময় বেশি লাগে। তবে দেশের অভ্যন্তরে ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এমন বিলম্ব হওয়ার কথা নয়।
এদিকে রোহিঙ্গাদের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে ইসির ভোটার ডাটাবেজ মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করেও দেশে ভোটার হওয়া বা ভুয়া পরিচয়ে ভোটার হওয়ার ঘটনা শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভোটার তথ্য বাতিলের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান ইসি সচিব।

জালিয়াতির ঝুঁকি কতটা?
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভোটার ডাটাবেজে প্রায় ছয় কোটি ভোটারের পূর্ণাঙ্গ বায়োমেট্রিক তথ্য—বিশেষ করে ১০ আঙুলের ছাপ ও আইরিশের তথ্য না থাকলেও শুধু এ কারণে ভোটার তালিকায় বড় ধরনের জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হবে না বলে মনে করেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং, অপরাধ তদন্ত, জমি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনআইডি ব্যবহারের কারণে নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ থাকা জরুরি।
জেসমিন টুলী বলেন, ভোটার তালিকার জন্য এটা খুব সমস্যা করবে না। কিন্তু পাশাপাশি আমরা যে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করি, ব্যাংকিং সেক্টর, ক্রাইম সেক্টরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রয়েছে। অনেক সময় জমি-জমা রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন কাজেও এসব তথ্য প্রয়োজন হয়। তাই জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য তথ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
বায়োমেট্রিক তথ্যের ঘাটতি কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা বা বিদেশিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু আঙুলের ছাপ বা আইরিশের তথ্য থাকলেই জালিয়াতি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। ভোটার নিবন্ধনের আগে মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আঙুলের ছাপ থাকলেও দুষ্টুচক্রকে যদি ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করা না যায়, তাহলে ফাঁকফোকর থাকবেই।

ভোটার তালিকায় ঢোকার আগে সরেজমিনে তদন্ত ও পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এগুলো ঠিকভাবে না করলে জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ভোটার তালিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই নয়, মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই ও পরিচয় নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
২০১৬ সাল থেকে স্মার্টকার্ড বিতরণের সময় এবং ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে হালনাগাদের সময় নতুন ভোটারের ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি নেওয়া শুরু করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। সবশেষ খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৮৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৫ জন।
এমএইচএইচ/জেবি