মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের রাজপথে যেমন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল, তেমনি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইতালি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সমাবেশ, অনলাইন প্রচারণা এবং রেমিট্যান্স শাটডাউনের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান। তাদের দাবি ছিল, দেশে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি ছিল ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’। আন্দোলনকারীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু প্রবাসী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বৈধ পথে দেশে অর্থ পাঠানো স্থগিত রাখেন। উদ্দেশ্য ছিল দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম ১৩ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৯৮ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু পরবর্তী ১১ দিনে সেই প্রবাহ নেমে আসে মাত্র ৫২ কোটি ডলারে। ফলে ২৪ জুলাই পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারে। রেমিট্যান্স প্রবাহে এই ধাক্কার প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারবাজারেও পড়েছিল বলে সে সময় জানিয়েছিলেন অর্থনীতিবিদেরা।
১৭ জুলাই দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রবাসীদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশে থাকা পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নির্ভর করতে হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া সীমিত তথ্যের ওপর। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা আন্দোলন আরও জোরদার করেন। তাদের ভাষ্য, দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও নীরব দর্শক হয়ে থাকার সুযোগ ছিল না।
শুধু রেমিট্যান্স বন্ধের আহ্বানই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সামনে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় নিউইয়র্কভিত্তিক ‘ইউনাইটেড ফর বিডি’ ব্যানারে আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক প্রবাসী জানান, ২০ জুলাই নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী অংশ নেন। নিউইয়র্ক পুলিশ কর্মসূচিতে সহযোগিতা করলেও কনস্যুলেট কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বহু বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করা হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সে সময় দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল বিএম জামাল হোসেন বিক্ষোভকে আমিরাত সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করে দেশটির কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করেছিলেন। এর ফলে অনেক প্রবাসী গ্রেফতার ও কারাদণ্ডের মুখে পড়েন।
প্রবাসীদের দাবি, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। আবার কেউ কেউ দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থেকেছেন। তাদের ভাষায়, দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে জীবন-জীবিকার ঝুঁকি নিয়েও তারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। নতুন সরকারের প্রতি আস্থা ফিরে আসায় প্রবাসীরা আবার বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো শুরু করেন। একই সঙ্গে হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেল ব্যবহারের পক্ষে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালান তারা।
এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশে ২ দশমিক ৩৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি।

রেমিট্যান্স প্রবাহে ঊর্ধ্বমুখী ধারা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান, যা আগের অর্থবছরের ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। পরের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ সেই রেকর্ডও ভেঙে যায়। ওই অর্থবছরে দেশে আসে প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক প্রবাসীর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীরা এখনো পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করছেন।
তাদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—আবুধাবির আল সদর কারাগারে আটক ২৫ জন বাংলাদেশিসহ আমিরাতের বিভিন্ন সিআইডি কার্যালয়ে আটক প্রবাসীদের মুক্তির উদ্যোগ, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের ‘জুলাই প্রবাসী যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি, দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্তি। দাবি আদায়ে তারা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে দেশের ভেতরের আন্দোলনের পাশাপাশি প্রবাসীদের আন্তর্জাতিক প্রচারণা, কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা এবং রেমিট্যান্স শাটডাউনের মতো কর্মসূচি আন্দোলনকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রবাসীদের অনেকেই মনে করেন, তাদের এই অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন ও যথাযথ স্বীকৃতি পেলে ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো জাতীয় সংকটেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশিরা আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে দেশের পাশে দাঁড়াবেন।
টিএই/জেবি