মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। টানা আন্দোলন, রক্তক্ষয়, দমন-পীড়ন ও অসংখ্য প্রাণহানির পর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দুপুরের পর দেশ ছেড়ে হেলিকপ্টারে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীসহ সারা দেশে উল্লাসের ঢেউ ওঠে। বিজয়ের আনন্দে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসে, ঢাকার বিভিন্ন সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকেও অসংখ্য মানুষ রাজধানীতে ছুটে আসেন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে।
তবে বিজয়ের উচ্ছ্বাসের সেই দিনটি একই সঙ্গে রয়ে গেছে রক্তাক্ত স্মৃতিরও দিন। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রকাশের পরও রাজধানীসহ কয়েকটি এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষও হয়। বিভিন্ন তথ্য ও নথি অনুযায়ী, সেদিন পুলিশের গুলিতে শতাধিক আন্দোলনকারী নিহত হন। ফলে ৫ আগস্ট একদিকে যেমন গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের দিন, অন্যদিকে তেমনি বহু প্রাণহানির বেদনাবিধুর স্মৃতি বহনকারী একটি দিন হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পরও পুলিশ তাদের ওপর অযথা গুলি চালায়। কিছু কিছু জায়গায় তাদের ঘিরে ধরে, আবার দূর থেকে স্নাইপারের সহায়তায়ও হত্যা করা হয়েছে। বিজয়ের এই দিনে আনন্দের পাশাপাশি শোকের মিছিলও ভারী ছিল। কেউ কেউ আনন্দ মিছিলে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি।
ঢাকার বাইরে সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই, চট্টগ্রাম, ফেনী, নরসিংদী, লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, রংপুর, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, পাবনা, মাগুরায় জনতার সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায়। কিছু জায়গায় লোকজন প্রতিরোধ গড়ে তুলে থানা ঘেরাও করে অগ্নিসংযোগ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সেদিন বিমানবন্দর এলাকায় এপিবিএন, যাত্রাবাড়ী, আশুলিয়া ও সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে পুলিশ কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এর জবাবে থানা ও পুলিশ সদস্যদের ওপরও হামলা চালায় জনতা। কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
জানা গেছে, সেদিন শুধু যাত্রাবাড়ী এলাকাতেই ৫২ জন নিহত হন। এই তালিকায় যুবক, শিশু ও বৃদ্ধ সবাই ছিলেন। সেদিন যাত্রাবাড়ী থানার তরুণ পুলিশ সদস্যরা ছিলেন বেশি উগ্র। তারা আন্দোলনকারীদের বেছে বেছে গুলি চালিয়ে হত্যা করেন।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী জুলাই যোদ্ধা মহিউদ্দিন রাব্বী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা সেদিন দুপুর দুইটার পর যাত্রাবাড়ী থানার দিকে আগাতেই তারা ভবন থেকে গুলি করে। এসময় একজন নিহত হয়। এরপর আমরা যখন থানার সামনে গিয়ে ঢাকার দিকে যেতে থাকি তখন তারা থানা থেকে বেরিয়ে আসে এবং আমাদের নির্বিচারে গুলি শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দশ থেকে বারজন।’

এই জুলাইযোদ্ধা বলেন, ‘সেদিন যাত্রাবাড়ী থানার উঠতি তরুণ পুলিশ সদস্যরা কোনো কারণ ছাড়াই ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। তারা এতটাই ক্ষিপ্ত ছিল যে, একেকজনকে তিন রাউন্ড করে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।’ তার মতে, ছাত্র-জনতার ওপর সেদিন এত গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা না ঘটলে জনতাও এত উত্তেজিত হতো না। তারা থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালাতো না।
সব মিলে সেদিন যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন অলিগলি ও সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ জন। থানা পুলিশ সেদিন দুপুরের পর থেকে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা শুরু করে। তা বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে গিয়ে থামে।
যাত্রাবাড়ীর ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, জোহরের নামাজ আদায়ের পর আমরা সবাই যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ছিলাম। হঠাৎ পুলিশ আমাদের ওপর গুলি শুরু করে। আমি অন্তত ১০–১৫ জনকে থানার সামনে মরে পড়ে থাকতে দেখি। পরে যখন গোলাগুলি থামে, তখন থানার সামনে পড়ে থাকা লাশগুলো নিয়ে আসি।
তারা জানান, যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশের সেদিন শেষ বিকেলে গুলি ও বারুদ শেষ হয়ে যায়। ফলে তারা আত্মসমর্পণ না করে শুরু থেকে গুলি চালাতে থাকে। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় ঢুকে পড়ে। তারা কয়েকজন পুলিশকে পিটিয়ে মারে এবং কয়েকজনকে মেরে ঢাকা-কুমিল্লা মহাসড়কে ঝুলিয়ে রাখার মতো ঘটনাও ঘটে।
তারা আরও জানান, সেদিন হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে, থানার সামনে ও আশপাশে বিক্ষোভকারীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে গুলি চালায় পুলিশ। ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে তাদের দমনের জন্য টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের পাশাপাশি সরাসরি প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করে। গুলিতে আহতদের অনেককে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। সেদিন কয়েকটি মরদেহ রাস্তা ও আশপাশে পড়ে থাকতেও দেখা গেছে।
রাজধানীর চাঁনখানপুলে দুপুরের আগে থেকে ছাত্র-জনতাকে গুলি করতে প্রস্তুত হন পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা। তারা ব্যাগে ব্যাগে গুলি, কার্টুজ ও অস্ত্র মজুদ করেন। হাসিনা পালানোর খবরে যখন লোকজন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে আসার চেষ্টা করছিল, তখনই তারা গুলির জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। দুপুরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাহবাগ ও গণভবনের দিকে অগ্রসর হওয়া ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মিছিলে পুলিশ ও এপিবিএন বাধা দেয়। এরপর তারা প্রথমে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও পরে রাবার বুলেট ব্যবহার শুরু করে মানুষ হত্যায় নামে। আন্দোলনকারীদের হত্যার পর একেকজন পুলিশ সদস্য সেদিন উচ্চস্বরে বলেছিলেন- ‘গুলি লাগছে, লাগছে’ ‘শেষ’ ‘মরছে, মরছে’। মৃত্যু নিশ্চিতের পর এপিবিএন ও পুলিশ সদস্যদের উল্লাস করতেও দেখা গেছে। যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে।
সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন রমনা জোনের সাবেক এডিসি আখতারুল ইসলাম। মূলত তার নির্দেশেই পুলিশ শুয়ে, বসে, কখনো হাঁটু গেড়ে, কখনো দাঁড়িয়ে একের পর এক গুলি চালিয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা করে। ফলে চানখাঁরপুল এলাকায় সাতজন শহীদ হন। যা পরবর্তী সময়ে দায়েরকৃত সেই ঘটনার মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে উঠে আসে। জানা যায়, ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় এডিসি নির্দেশ দেন এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য কনস্টেবল অজয় ঘোষ তার হাতে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি চালান। এছাড়া অজয়ের পাশে সেদিন অন্য পুলিশ সদস্যরাও একইভাবে গুলি চালিয়েছিলেন।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন সংবাদকর্মী ‘এখন’ টেলিভিশনের সাবেক কর্মী আজহার লিমন। তিনি সেই ঘটনার আদ্যোপ্রান্ত তুলে ধরে বলেন, ‘ওইখানে গিয়ে যা দেখলাম, ছাত্র-জনতা দুই দিক থেকে সেখানে ঢোকার চেষ্টা করছে। আর পুলিশ মেরে ফেলার জন্য গুলি করছে। সেখানে কাকে কাকে মারতে হবে তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার আশরাফুজ্জামান ও এডিসি আকতার নামে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। সেখানে সুজন নামে এক কনস্টেবল ছিলেন। যিনি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গণহত্যা মামলার আসামি। সেদিন তার হাতে প্রথমে ছিল টিয়ারগ্যাস মারার যন্ত্র। পরে তার হাত থেকে সেটি নিয়ে চাইনিজ রাইফেল তুলে দেন এক পুলিশ সদস্য।’
এই সাংবাদিক বলেন, ‘আমি নিজেই দেখলাম, সুজন একজনকে গুলি করে মেরে ফেললেন। এরপর সুজন বলছিলেন, যা (বিশ্রি একটা গালি) পড়ে গেছে। সেই যুবক গুলি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মাটিয়ে পড়ে যান। সুজন গুলি করে তাকে চোখের সামনে মেরে ফেলেন। একটা কলা গাছকে কেটে ফেলে দিলে যেমন পড়ে যায়, তেমনি সেই লোকটি মাটিতে পড়ে গেলেন। পরে তাকে ধরাধরি করে আন্দোলনকারীরা সরিয়ে নেয়। এরপরও সুজনের গুলি থামছিল না। এরপর দেখলাম, গুলি করার পর সুজন কার সঙ্গে যেন ভিডিও কলে কথা বললেন। গুলির দৃশ্য দেখে আমাদের খারাপ লাগছিল, কিন্তু তার মাঝে কোনো বিন্দুমাত্র অনুশোচনাবোধ দেখতে পাইনি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব ও উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে। সকাল থেকে হাজারো আন্দোলনকারী উত্তরা পূর্ব থানার সামনে অবস্থান নেয়। এসময় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করে। আন্দোলনকারীরাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে অন্তত ১০ জন নিহত হন।
পরে উত্তেজিত জনতা উত্তরা পূর্ব থানায় প্রবেশ করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। থানার ভবন, পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত যানবাহন এবং আশপাশের সরকারি স্থাপনায় আগুন দেয়। একই সময়ে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায়ও ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সেখানেও বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বহু পুলিশ সদস্য থানা ত্যাগ করেন এবং আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
আশুলিয়ায় ৫ আগস্ট সকাল থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেয়। পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশের নির্বিচারে গুলিতে কয়েকজন মারা যান। তাদের লাশ জড়ো করে সেদিন পুলিশ একটি ভ্যানে তুলে স্তুপ বানিয়ে তা আগুনে পুড়িয়ে দেয়।
সেই দৃশ্য উপস্থিত জনতাকে প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এরপর তারা জড়ো হয়ে থানা ঘেরাও করে। এ সময় সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও নিহত হন। পরে দুই পুলিশ সদস্যের মরদেহ ওভারব্রিজে ঝুলিয়ে রাখে বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভকারীদের একাংশ আশুলিয়া থানা ও আশপাশের সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি প্রতিহত করতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এদিন রাজধানীর বাইরেও চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা, ফেনীর মহিপাল, সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বগুড়া শহর, কুষ্টিয়ার মজমপুর গেট, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী, ভোলা ও চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে বিক্ষোভকারীদের ওপর মুহুর্মুহু গুলি চালানো হয়। এসব স্থানে পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় শত শত মানুষ হতাহত হন।
এমআইকে/জেবি