Dhaka Mail Logo

জাতীয়

আড়ালেই রয়ে গেছেন অসহযোগে সাড়া দেওয়া 'একমাত্র' সরকারি কর্মকর্তা

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫০ পিএম

  • জুলাইয়ের বড় অর্জন মানুষের বাক স্বাধীনতা
  • ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো ছিল নৈতিক দায়িত্ব
  • আমি আগে দেশের নাগরিক, পরে কর্মকর্তা
  • সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি
  • ব্যাংকিং খাত কারো কাছে জিম্মি হওয়া চলবে না
  • জুলাই স্পিরিট কাজে লাগালেই মিলবে প্রকৃত অর্জন

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনের পর দুই বছর অতিবাহিত হয়েছে। এরই মধ্যে সবাই যখন কৃতিত্ব ভাগাভাগিতে ব্যস্ত তখন নীরবেই কাজ করে যাচ্ছেন ছাত্র-জনতার ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে প্রকাশ্যে একাত্মতা ঘোষণাকারী একমাত্র সরকারি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক। আন্দোলনে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরও তাকে ক্রেডিত নিতে দেখা যায়নি। অনেকে হয়তো সেভাবে চিনেনও না তাকে। জুলাইকেন্দ্রিক তেমন কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না। তবে তিনি নীরবেই আহতদের জন্য কাজ করেছেন। আবারও ফ্যাসিবাদের জন্ম হলে কিংবা জাতির প্রয়োজনে আগের মতোই ভূমিকা রাখবেন বলে জানিয়েছেন নজরুল ইসলাম।

২০২৪ সালের ২ আগস্ট নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এরমধ্যে ৩ আগস্ট সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও ৪ আগস্ট সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। ৩ আগস্ট সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল পালিত হলেও ৪ তারিখ অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দেননি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বরং উল্টো আন্দোলনকারীদের নাশকতাকারী আখ্যা দিয়ে তাদের বিপক্ষে মাঠে নামেন অনেক সরকারি কর্মকর্তা। তবে একজন মাত্র কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। ৩ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি আন্দোলনে সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং সেটা গণমাধ্যমেও জানান।

সেদিন ফেসবুকে তিনি লিখেন, ‘আমি মো. নজরুল ইসলাম সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। দীর্ঘ ১৫ বছর চুপ থেকে এই সরকারের খুন, ব্যাংক লুট, দুর্নীতি সহ্য করেছি। কথা বলতে পারিনি। সম্প্রতি সাধারণ ছাত্র—ছাত্রীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা ও অনিয়মের কথা আমরা বলতে পারছি না— হৃদয় যেন আমাদের অন্ধ হয়ে গেছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রের মালিক জনগণ তথা ছাত্রদের সঙ্গে থাকব, ইনশাআল্লাহ।’

সেদিন তিনি আরও জানান, ‘রাষ্ট্রের মালিক যদি জয়লাভ করে, তাহলে হয়তো আমি আবার রাষ্ট্রের মালিকের সেবা করতে ফিরে যাব। আর এই খুনি, ব্যাংক লুটেরা, দুর্নীতিবাজ সরকার যদি টিকে যায় তবে আমি হয়তো চাকরিতে ফিরব না।’

একই দিনে আরেক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘১৫ বছর তিন তিন বার অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিক শক্তি, মনোবল নষ্ট করে দিয়েছে। হৃদয় তাদের নিবু নিবু অবস্থা। কথা বলতে পারে না। এ সময় ইয়ং ছাত্র সমাজ জেগে উঠেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্রুটি তারা ধরতে পেরেছে।  জীবন দিচ্ছে পরিবর্তনের জন্য। তাদের কাছে আমাদের শিখতে হবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা যদি না দাঁড়াই তাহলে তাদের রক্ত বৃথা যাবে। এটা হতে পারে না।’

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নজরুল ইসলামের। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির অনুষদ সদস্য হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, জুলাইকে যদি কেবল একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে জাতি হিসেবে এর সম্ভাব্য সুফল থেকে বঞ্চিত হতে হবে। তবে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে একে ধারণ করা গেলে ভবিষ্যতে দেশ আরও বেশি উপকৃত হতে পারে।

নজরুল ইসলাম বলেন, গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাইকে কেন্দ্র করে একটি কর্মসূচির আয়োজন করেছিল। কিন্তু এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বিষয়ে কোনো কর্মসূচি নেই। তার মতে, জুলাই ছিল মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের একটি ‘রেভল্যুশন টাইপ’ ঘটনা, যা দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

এই ব্যাংকার বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষ এখন নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে পারছে এবং কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকার যদি এই চেতনাকে ধারণ করে সামনে এগোয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ আরও বেশি লাভবান হবে।

Nazrul2
জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

এ প্রসঙ্গে তিনি জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের আন্দোলনের পর দেশটিতে যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে দেয়। একইভাবে কোনো আন্দোলন একটি জাতির মধ্যে নতুন স্পিরিট তৈরি করে। সেই স্পিরিটকে কাজে লাগাতে পারলে উন্নয়নের পথ আরও গতিশীল হয়।

ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট তৈরি হলে নিজের ভূমিকা কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এখনো কার্যকর ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ নীতিমালা না থাকায় অনেকেই সত্য তথ্য প্রকাশ করতে পারেন না। তবে সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের স্বার্থে ভুল সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের বিষয় সামনে আনার দায়িত্ব সচেতন নাগরিক হিসেবে পালন করা উচিত।

নজরুল বলেন, আমার দুটি পরিচয় আছে—একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে, অন্যটি বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে। জনগণের স্বার্থই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে আমি অবশ্যই জনগণের পক্ষেই দাঁড়াব।

দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত থাকার কথা জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘জাতির প্রয়োজনে বা কোনো ক্রান্তিকালে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া আমার দায়িত্ব। দেশের স্বার্থে বড় কোনো ত্যাগের প্রয়োজন হলে আমি সেই ভূমিকা পালন করব।’

সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিচালক বলেন, জুলাই যে সংস্কার ও পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত যেন কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না যায় এবং জনগণের আস্থা বাড়ে, সে জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে একযোগে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। এতে জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে এবং দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

টিএই/জেবি